মারিয়া সালামের গদ্য ‘ইসলামি প্রতীক ও ধ্বনি নিয়ে সাহিত্য’
ছাড়পত্র ডেস্কপ্রকাশিত : জুলাই ১২, ২০২৬
ইসলামের প্রতীক, ধ্বনি বা অজানা শক্তি নিয়ে কি সাহিত্য হবে না? এই প্রশ্ন মনে অনেকবার উঁকি দিয়েছে আগেও। নতুন করে আরেকবার দিচ্ছে। সেই প্রেক্ষিতেই থিওলজি আর ভাষাতত্ত্ব নিয়ে যেটুকু পড়াশোনা আছে, তার ভিত্তিতে কয়েকটা বিষয় ব্যাখ্যা করছি।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে কুন ফায়াকুন হলো আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির বর্ণনা। কুন كن আরবি শব্দ, যার অর্থ হও। ফায়াকুন فيكون অর্থ এরপর তা হয়ে যায়। কুরআনে এটা আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, তখন তিনি বলেন ‘হও’, এবং তা হয়ে যায়।
এটা এমন নয় যে, আল্লাহ একটা শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করে মহাবিশ্ব তৈরি করেন। কুরআনের তাফসিরে ‘কুন’ বোঝায় আল্লাহর ইচ্ছা ও আদেশ, যা মানুষের কণ্ঠস্বরের মতো শব্দতরঙ্গের ওপর নির্ভরশীল নয়। কুন ফায়াকুন আল্লাহর সৃষ্টিশীল আদেশের বর্ণনা; এটা কোনো নির্দিষ্ট শব্দকম্পাঙ্ক বা কসমিক ফ্রিকোয়েন্সি নয়।
ইন্টারনেটে যেসব পপুলার কথাবার্তা পাওয়া যায়, তাতে কুন ফায়াকুন = ৪৩২ Hz, কুন ফায়াকুন = ৫২৮ Hz, বা কুন ফায়াকুন = শুম্যান রেসোন্যান্স। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে কোনো পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা ইসলামি প্রামাণ্য সূত্র নাই।
ইসলামের মিস্টিক বা সুফিবাদের কথা বলতে গেলে, অনেক সুফি আলিম কুন ফায়াকুনকে শুধু সৃষ্টি নয়, মানুষের আত্মিক রূপান্তরের প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন। সুফিবাদে এটা আল্লাহর অসীম সৃষ্টিশক্তির প্রতীক, মানুষের অন্তরের আধ্যাত্মিক রূপান্তরের প্রতীক আর আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক।
জালালুদ্দীন রুমির কবিতায়ও ‘কুন’য়ের ভাবধারা আল্লাহর প্রেম ও আত্মার জাগরণের প্রতীক। ইমাম আল-গাজ্জালির মতে, কুন ফায়াকুন মূলত আল্লাহর সর্বশক্তিমান ইচ্ছার প্রকাশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, আল্লাহর ইচ্ছা মানুষের ইচ্ছার মতো নয়। আল্লাহ কিছু সৃষ্টি করতে চাইলে কোনো উপাদান, সময় বা প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয় না।
‘কুন’ মানুষের ভাষায় বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে; আল্লাহ মানুষের মতো মুখে শব্দ উচ্চারণ করেন—এমন অর্থে নয়। বড় পীর আব্দুল কাদির জিলানী ভাবতেন, কুন ফায়াকুন আল্লাহর একচ্ছত্র ক্ষমতার নিদর্শন। কোনো ওলি বা সাধক নিজের ইচ্ছায় ‘কুন’ বলতে পারেন না; ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর।
সুফি সাহিত্য ‘কুন ফায়াকুন’য়ের গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করলেও, এটাকে কোনো বৈজ্ঞানিক কম্পাঙ্ক বা ম্যাজিক সূত্র হিসেবে উপস্থাপন করে না। তাদের মতে, মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি সত্য উপলব্ধি ও আল্লাহর নৈকট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো গোপন শক্তি বা শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে নয়।
মাখরাজ আরবি ধ্বনিবিজ্ঞান Phonetics ও উচ্চারণবিদ্যার Articulation একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষের বাক্যন্ত্রের vocal tract কয়েকটা নির্দিষ্ট স্থান থেকে আরবি বর্ণের সঠিক উচ্চারণ উৎপন্ন হয়। মাখরাজ গুরুত্বপূর্ণ কারণ, কোনো বর্ণের মাখরাজ ভুল হলে শব্দের উচ্চারণ পরিবর্তিত হতে পারে, এমনকি তার অর্থও সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।
প্রখ্যাত তাজবীদ বিশারদ ইমাম ইবনুল জাযারীসহ (রহ.) প্রাচীন আলিমরা মাখরাজকে ৫টি প্রধান অঞ্চলের Primary Regions অধীনে ১৭টি বিস্তারিত উচ্চারণস্থলে Articulation Points ভাগ করেছেন। মাখরাজের উপকারিতা মূলত সঠিক উচ্চারণ, শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ, কণ্ঠস্বরের দক্ষতা এবং মানসিক প্রশান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।
কিন্তু মাখরাজ কি শরীরের কোষ পরিবর্তন করে? ডিএনএ পরিবর্তন করে? শরীরের কম্পাঙ্ক frequency বদলে দেয়? শুম্যান রেসোন্যান্সের সঙ্গে সংযুক্ত হয়? বা অলৌকিক শারীরিক শক্তি সৃষ্টি করে? বিশেষ অতিপ্রাকৃত শক্তি, নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক বা অন্য সব ভাষার তুলনায় বৈজ্ঞানিকভাবে শ্রেষ্ঠ হওয়ার কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ আছে? এতে যেমন মস্তিষ্কের Broca`s area ও Wernicke`s area সক্রিয় হয়, অন্য ভাষায় কি হয় না?
জিকিরের শব্দ শরীর ও মনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং অবশ্যই ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, ছন্দময় ও মনোযোগ সহকারে কোনো শব্দ, প্রার্থনা, মন্ত্র বা জিকির বারবার উচ্চারণ করলে হৃদস্পন্দন ধীর হতে পারে, শ্বাস-প্রশ্বাস আরও নিয়ন্ত্রিত ও গভীর হতে পারে, মানসিক চাপ stress ও উদ্বেগ anxiety কমতে পারে, কিছু ক্ষেত্রে রক্তচাপ সাময়িকভাবে কমতে পারে আর মনোযোগ ও প্রশান্তির অনুভূতি বাড়তে পারে।
কিন্তু তাতে কি শরীরের কোষের গঠনে পরিবর্তন হয়? ডিএনএ বদলে দেয়? শরীরের বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সি স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করে? শুম্যান রেসোন্যান্সের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়? বা নির্দিষ্ট শব্দতরঙ্গের কারণে অলৌকিক শারীরিক পরিবর্তন ঘটায়? এটা সত্য যে, বিজ্ঞান মানসিক ও শারীরিক কিছু প্রভাব পরিমাপ করতে পারে, কিন্তু আধ্যাত্মিক প্রভাবকে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রে সরাসরি পরিমাপ করা যায় না। কিন্তু সেটা তো বিশ্বাসীর জন্য মন্ত্রজপেও হয়।
আজানের কম্পাঙ্ক কত হার্টজ? খালি গলায় সেটা কত? আর মাইকে কত? সর্বোচ্চ কত আর সর্বনিম্ন কত? সদ্য ভূমিষ্ট শিশুর কানে আজান দিতে হয় কোন কম্পাঙ্কে? ইসলাম কি বিশ্বব্যাপী আজানের কম্পঙ্ক নির্দিষ্ট করে দিয়েছে? যেসব শিশুদের কানে আজান দেয়া হয় না, তাদের ক্ষেত্রে কী হয়?
আরবি হরফের অতিশক্তি, ধ্বনির তেজ এই বিষয়গুলো মূলত ধর্মীয় অকাল্টিজম Religious Occultism চর্চার অংশ। সেটা কয়েকটা পাঠ্যবই পড়ে আলোচনা করাটা বাতুলতা। তবে আলোচনা প্রাথমিক পর্যায়ে রেখে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করাই যায়, তাহলে কি সাহিত্যে ধর্মীয় অকাল্টিজম Religious Occultism চর্চা করা যাবে না? বিভিন্ন ধর্মের গোপন hidden বা esoteric জ্ঞান, প্রতীক, মন্ত্র, সংখ্যা বা আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অজানা শক্তি বা জ্ঞান অর্জন নিয়ে তো অনেক উপন্যাস আছে। তাহলে, ইসলামের প্রতিক, ধ্বনি বা অজানা শক্তি নিয়ে কেন সাহিত্য হবে না?
ইসলামে রহস্যবাদ আর গোপনধারা কিন্তু এক বিষয় নয়। রহস্যবাদ বা মিস্টিসিজম ঈশ্বরের নৈকট্য, অন্তরের পরিশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার ওপর জোর দেয়। আর অকাল্টিজম গোপন জ্ঞান, প্রতীক, আচার বা বিশেষ শক্তি অর্জনের দাবির ওপর বেশি জোর দেয়। যেমন: সুরের সাধনা করে গায়েব হয়ে যাওয়া।
অকাল্টিজম কী নিয়ে চর্চা করে? মূলত যেসব নিয়ে চর্চা করে: ইলমুল হুরুফ বা অক্ষরের জ্ঞান: এই ধারায় বিশ্বাস করা হয় যে আরবি অক্ষরগুলোর প্রতীকী ও সংখ্যাগত তাৎপর্য রয়েছে। কিন্তু অক্ষরের মধ্যে অতিপ্রাকৃত শক্তি আছে—এমন ধারণা মূলধারার ইসলামি আকিদার অংশ নয়। আবজাদ: আরবি অক্ষরের সঙ্গে সংখ্যা যুক্ত করা। কেউ কেউ গুপ্ত জ্ঞানের জন্য ব্যবহার করেছেন, কিন্তু এই ব্যবহার মূল ইসলামে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত। ইলমুল আওফাক علم الأوفاق বা সংখ্যার চৌকো বিন্যাস magic squares।
অকাল্টিজম এটাকে আধ্যাত্মিক প্রভাব হিসেবে দেখে আর মূলধারা সেটা বর্জন করে। ফলে, মূলধারার ইসলামের সঙ্গে সুফিবাদ বা রহস্যবাদ সাংঘর্ষিক না হলেও, অকাল্টিজম একদমই সাংঘর্ষিক। ফলে, ধর্মীয় অকাল্টিজম আর ধর্ম দুইটাকেই একসাথে মহিমান্বিত করার চেষ্টা খুবই খাপছাড়া বিষয়।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সংবাদকর্মী
























