মাসুদ পথিকের কবিতাগুচ্ছ
প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯
একজন অপদার্থের আত্ম-উপলব্ধি
এসো হে, আমাকে অ্যারেস্ট করো, বন্দি করো
হে অসমাপিকা বৃষ্টি
আমাকে একঘরে করো
নাও ডিটেনশনে, আমি কেন খেতে পাই না
আমি কেন বাসা ভাড়া দিতে পারি না
আর, আমাকে ফাঁসি দাও
করুণার জলে ভিজিয়ে কবরে নামাও
নয়তো মাটি চাপা দাও হে বর্ষণক্লান্ত আকাশ
অথবা আমাকে ভিনগ্রহে নিয়ে যাও
পৃথিবীতে আমার ভূমি নাই, আমি ভূমিহীন
বিক্রি করে দিয়েছি সিনেমা নির্মাণের নামে
হে পরশ্রীকাতর অব্যয় হে সন্দেহভাজন সজন
তোমাদের আঘাতে রক্ত ঝরছে দেখো গহীনে,
হৃদপিণ্ডের মাংস খেয়ে নিচ্ছে শখের বেড়াল
আমার প্রেমিকা, সে-ও চলে গেছে অনটনে, আর স্বভাবে
কেননা আমি আসলে কেউ না
আমি এক অপদার্থ, অন্তশূন্য কাঁদা, আহা। মর...
এইতো তুমি দু`পায়ে মাড়িয়ে গেলে সহসা
তোমার রঙিন সানগ্রাস এবং বৃষ্টির মার্জারি
শিখে নিয়েছে সুশীল মার্কস ইজম
আর গহীনে নিহিত কালোবাজারি
আমি তোমার হাতের পণ্য এবং এক হারামি
ঢেলে দেই?
ধরো আমি মিথ্যুক কোনো
কেননা আমি বা আমরা গড়েছি সমাজ এবং বলছি সভ্যতা, উঁচু
তবে কিন্তু আমি সভ্য নই, উঁচুনিচু
ধরো আমি একদম ভালো নেই
কিন্তু আমার সমাজ আমাকে শেখায় `খুব ভালো আছি` কমন বাক্য বলতে এই
ধরো বৃষ্টি এলো, ভিজে যাচ্ছে, ভেসে যাচ্ছে বাস্তু আর ভাব
তবুও বলছি, আহা বৃষ্টি কত সুন্দর! মহানুভব
ধরো, এই তুমি বিচ্ছিরি ম্যাকাপ নিলে মুখে, আর চুলে
আমি বলছি, অপূর্ব!
আর আমার মন চাচ্ছে তোমার দেহ
মুখে বলছি, ভালোবাসি মন, আর চাই নিষ্কাম স্নেহ
অথচ জেনো, মন বলে কিছু নেই
আছে হৃদপিণ্ড ও মেমোরি
প্রচলের পুজো করে যাচ্ছি বেহুদায়
আমি বাহারি ক্রীতদাস, বাজারি
ধরো আমি অবদমন, ধরো আমি গহীনে নিহিত ট্যাবু
না-খেয়ে খেয়ে মারা গেছি কবেই, তোমরা ভালোবাসা `ঢেলে দিচ্ছ` তবুও
ধরো, ধরো আমি ধানক্ষেত! আমার ভাবনাগুলো আগাছা ও ধানগাছ
উড়ে আসে হালিক, উড়ে যায় বাবুই, মেঘ এসে মুখ করে কালো! পড়ে বাজ
তুমি বলো, আহা পরাবাস্তব নাচ!
আর ডিপ্রেশন
আর, সন্ধ্যার ডিপ্রেশন থেকে ঝরে পরকীয়া শীৎকার
পালিত হাঁস গৃহ ছেড়ে এই যে কচুরিপানায় ডিম পেড়ে গেল
এর কী মানে আছে প্রমিত জীবন বোধে?
যদিও দূর শাপলার বনে ডেকে ডেকে ক্লান্ত ডাহুক,
করে রক্তবমি পোয়াতি ডিমের গায়
কিছু মূর্ত প্যারাডাইম ভেঙে যায় অবদমনের চাপে
ভেঙে টুকরো হয়ে যায় সমাজ সংকোচ স্মিফনি
হাঁসগুলো এমন কোমল শব্দ পেটে ফেরে গৃহস্থ ঘরে
রিচ্যুয়াল ভেবে জীবনানন্দ এইসব শব্দ পঙ্ক্তিতে দেন ছড়িয়ে
ডিপ্রেশনের গন্ধে রাত্রি আসে ব্যর্থ সঙ্গমের মধ্যে
স্বমৈথুনের কুয়াশায় ঢাকা পড়ে হাঁসের কোলাহল
আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে জলের ডালপালা, পথিমধ্যে
বাজার ধর, আহা
সবুজ সবজির আকাঙ্ক্ষায় আলস্য জমে জমে
তোমারও সকালের ঘুম দীর্ঘ হলো
ক্ষেতের মাটিতে ইউরিয়া মেশাচ্ছে এই ভোরে যে চাষি
তার গ্লাণির লাজুক রাস্তায় ঢুকে গেছে কর্পোরেট যুবতী
আর তোমার চর্বিবহুল পেটের হতাশার গন্ধ পালিত বেড়ালের
পাশ দিয়ে যায়
ব্যয়ামাগারে জমা হলো কত কত শ্রমহীন ঘাম
অথচ কোথাও তো অনাবাদি পড়ে রইলো বসুন্ধরা
কবরের থেকে উঠে আসা মানুষেরও দেখা মেলে এই বাজারে
সবজির প্যাকেটের পাশেই মনুষ্য চর্বির বয়াম
আহা, এমন আলোকোজ্জ্বল ইকোনমিও তোমাকে আহত করে যদি
তবে বসো-না কেন আজ উৎপাদন অবজেক্টিভের সামনে
দূরত্ব বিষয়ক মিথ এবং ট্যাবু ভেঙে যাওয়ার পর
সময় তো কোনো সাবজেক্টই নয়
সো, কবরের অন্ধকারের গন্ধ থেকে যতটুকু অনুশোচনা
ছুড়ে মারে তাহেরীরা, তার বেশি ভিজ্যুয়াল রমণ তোমারও আছে,
সামাজিক আলোকায়নের বিপ্রতীপে
তোমার আলস্যজুড়ে এই মৃদু ভীতি তা মৃত্যুর মতো না
তবুও সবুজ সবজি বিক্রেতার ডালায় কেন খোঁজো সজীবতা
যখন বিজ্ঞানের নিউ হুইলটা হাতের মুঠোয়
দেয়াল জুড়ে হাসছে সময়ের সবান্ধব এনিমি
বিলবোর্ডে কামনা মিশ্রিত তারকার বুক এলানো কতখানি
ততখানিই পতনোন্মুখ মানুষ্যত্বের বাজার ধর, রিয়্যলি
জানি, এমনই চমক নতুন প্যাকেজ
তোমার কোম্পানির বেতার তরঙ্গ করছে ধারণ চাষার নিরুপায় সঙ্গম শব্দগুলিও
কী সুন্দর ওপেন প্রডাক্টিভিটি! আহা!
শাড়ি ও মালতি ধান
শাড়ির হিস্ট্রি জানে না তরুণী, কেবল গাঁয়ের ভিতরে,
সুতি ও মলিন গা ঘেঁষে প্রতীক্ষার দাঁড়িয়ে থাকা, তাঁত বোনা।
ঘরের ভেতরে তার সমূহ মিথ ও মায়া,
উঠানে ধুলোর সন্তান করে খেলা, অভিমানের আবছায়া।
শ্রুতিরা আজও ঘোরে দলবেঁধে, তার বুক চিরে চলে গেছে
এক মধুর প্রেম কাহিনি।
আর ফেরার রাস্তাটি যুবতী ধানক্ষেতের ভেতরে নিয়েছে বাঁক,
তরুণীর দেহে লেগেছে কাদামাটি।
এমনও হয় মাঠের কাজ শেষে, তরুণটি আসে আঙিনা বরাবর, এখন
তরুণীর কান্নাভেজা চোখের সামনে শূন্য খাঁচা শুধু,
পালিত দোয়েলের শোক।
শাড়ির আঁচল ভিজে যায়, বিরহের আবহ সংগীত হয় মন জঙ্গলে
আসে শীত, আসে জৈব হীমপাখি।
তরুণ কী ভাবে? শ্রুতির শেষ সন্তান যেন তরুণ!
তরুণীকে জড়িয়ে, কী করে?
মেখে না-মেখে বুকের কাদায় নিহত দোয়েলের গানগুলি।
ভূতগ্রস্ত সন্ধ্যায় তরুণীর বিষণ্ণতার গর্ভে বোনা হলো আরো শাড়ির হিস্ট্রিখানি, আর মালতী ধান বীজ।























