লতিফ জোয়ার্দারের একগুচ্ছ কবিতা

প্রকাশিত : এপ্রিল ২৩, ২০১৯

জীবনানন্দ দাশ

একজন জীবনানন্দ দাশ একটা ট্যামগাড়ি আর একটা সুইসাইড নোট
বালক তার কবিতার খাতা ছিঁড়ে ফেবিকলে জোড়া লাগায় ছেঁড়াকাগজ
আকাশে উড়বে সে একদিন ঘুড়ি হবে। একদিন কবি হতে হতে সবিতারা
হারিয়েছিল তার। এখন সে মধ্য আকাশের পাখি। উড়ে বেড়ায় ঘুরে বেড়ায়
আকাশ বোঝে না হৃদয়ের কথা। তার বুকে বাজে না আর জীবনানন্দের ব্যথা

আগুনলিপি

কত বীভৎস স্পর্শ ফিরিয়ে দিয়েছি চতুরতা ভেবে
মরণচিতায় জ্বলে ওঠা আগুনে ভষ্ম হোক এ দেহ।
সব ভনিতা রেখে একদিন বুকের দহন দিয়ে
লিখেছিলাম আগুনলিপি। কেতাবের পাতায়
পাতায় যতই পড়ি শুদ্ধতার বাণী। একদিন সব
অন্ধকার আলোকিত করে ঋণখেলাপির মতো পালিয়ে
যাব, দূরে বহুদূরে। তখনও কী আমাকে ফেরাবে তুমি
আবার আমার অপেক্ষায় সময় ভেঙে দ্রতগামী ট্রেন
স্টেশন মাড়িয়ে যাবে। সবুজ সিগনাল বাতি হারিয়ে যাবে।
সকল চতুরতায় আবার আমাকে খুঁজবে তুমি বিবর্ণ অন্ধকারে।
 
তাড়া

এখন আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না আমার
মনে হয় একলা একা একটা ঘরে শুয়ে থাকি আমি
রাত্রি নিশি হোক আর কোনোদিন ঘুম না ভাঙুক
স্বজনেরা রাতভর কেঁদে কেঁদে হোক সারা
ঘুম থেকে জেগে এখন আর দাঁতব্রাশের নেই তাড়া।
 
এখন আর আমার আয়নায় মুখ দেখতে ইচ্ছে করে না
কেবলি স্মৃতির আয়নায় দেখি নিজের মুখ
মুখ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ি আমি।
এখন আর ভাবনায় থাকে না। আমায় কে কবে
দু-দণ্ড দিয়েছিল পরম সুখ।

এখন আর বাজারের ব্যাগ হাতে দামদর করি না
আলু পটলের। এখন আমি তো ভোটের পোস্টারের মতো
দড়িতে ঝুলে থাকি, কিছু কিছু মগজে কিছু লোকের।
আমি এখন মসজিদের ছিন্নি হই দুই-চার দিনের শোকের।

এখন আর ভাল্লাগে না তাই নেই আমার কোনো ছুটোছুটি
ঘুম থেকে জেগে চোখের আলোয় আর জ্বলবে না প্রিয়মুখটি
ক্লান্তি শেষে জুটবে কী জুটবে না একখানা পোড়া রুটি।
এখন আর আমার পুরনো জুতো সেলাইয়ের নেই তাড়া
ঘুম শেষে তোমাদের মনে হবে এখন আর আমি নেই
কোনো এক চৈত্রের শীতালী ভোরে আমি গেছি মারা।

ছায়া
 
তুমি চলে যাবার পর অন্ধ মুগ্ধতায় ফিরে যাই
আমার ছায়ার ভিতর তোমায় অবলোকন করি।
মনে হয় আলোর বিপরীতে হেঁটে যাচ্ছ তুমি
মনে হয় রেলগাড়ির মতো ছায়াপথ মাড়িয়ে যাচ্ছ।
কেমন যেন শব্দের বিপরীতে শব্দ খেলা করে যায়
ছায়ার বিপরীতে ছায়া। আমার বুকের ক্ষতচিহ্নে
লু হাওয়া। কখনো তপ্ত দুপুর নিয়ে ঘরে ফিরি আমি
ক্লান্ত পথিক যেন। এক শহর দুঃখের তৈলচিত্রের সাথে
বসবাস আমার। এক নদী ঘোর। তুমি চলে যাবার পর
সকল ঘোরের মধ্যে তোমায় দেখি। এক মুহূর্তের এক
স্বপ্ন আমায় দিয়ে এক দীর্ঘছায়া হয়ে যাচ্ছ তুমি।

ঘুম

একটা রাত না ঘুমুলে সকালবেলাটায় ঘোর লাগে
ঘুম চোখে মনে হয় অপেক্ষার চেয়ে ঘুম ভালো
সে কারণে আমি ঘুম কাতুরে হয়ে যাই। অতঃপর
ঘুমের ভিতর চায়ের কাপের মতোই ছোট্ট পৃথিবী
অবলোকন করি। আমার সেই পৃথিবীতে তুমি নেই
অন্য এক নারীর আঁচল ধরে বসে আছি আমি।

রঙ

মনে করো
একটা ঘোর সঙ্গে নিয়ে তুমি এলে।
আর আমি ভাবলাম
আজ বিকেলটার রঙ বদলাবে।
মলিনতার ভাঁজ খুলে সন্ধ্যা প্রদীপ হাসবে।
অতঃপর তোমার বুকের অধর খুলে দেখবে    
তিন শত তের দিন দূরে থাকার হলুদ ক্ষত

প্রেম ও রাষ্ট্রযন্ত্রণা

মনে করো আমার পৃথিবীতে তুমি একা
কোথাও আর কেউ নেই
দু-হাত বাড়িয়ে দিয়েছি ওই আকাশের দিকে
তারপরও মনে হবে
আমাদের কত যুগ কত বসন্ত পেরিয়ে
হয়নিকো দেখা। এভাবেই রাত্রি আসে।
সব ফুলের গন্ধ বাতাসে ভাসে।
কোথাও কেউ নেই
দূরে ওই অন্ধকারে সব সবুজ হারিয়ে গেছে
সব মুগ্ধতা এলোমেলো হয়ে আছে।
কেবলি কিছু রাতজাগা পাখি
মধুর আলিঙ্গনে ব্যস্ত হয়ে আছে।
মনে করো আমার পৃথিবীতে তুমি একা
ক্ষমতার দম্ভ থেকে কিছুটা দুরে।
এই  মানচিত্রে তোমার পায়ের দাগ পড়ে আছে।
কিছু কিছু  রাষ্ট্র যন্ত্রণা যেমন একা থাকে না
রটে যায় মানুষের কানে কানে।

মনে করো একদিন ভেজা সকাল বেলায়
পিচঢালা পথে ব্যস্ততার ভিড় নেই কোনো
গাড়ির বহর থেকে কিছুটা দূরে
পাশাপাশি তুমি আমি।
ঘর থেকে নরম আদরের আশায় সকল ভিন্নতা মাড়িয়ে।
এই গন্ধমাখা শহরের কাছে কিছু কথার বর্ণিল আভায়
আমাদের যন্ত্রণার দরোজা খুলে যায়
আমাদের সম্পর্কের আলোকলতা জড়িয়ে থাকে
এক বৃক্ষ থেকে আরেক বৃক্ষে। আমাদের মৌনতা
হারিয়ে যায় এক পৃথিবী থেকে আরেক পৃথিবীতে।

এভাবেই কাশবন হয়ে যায় আমাদের প্রেম ভালোবাসা
অতঃপর দিন থেকে দিনে আর হয় নাকো আমাদের দেখা
আমাদের এই বুকের যন্ত্রণাগুলো বুকের অধরে রেখে
নতুন প্রত্যয়ে হিসেবের খাতা খুলি
আমাদের সম্পর্ক এখন ক্রসফায়ারের গুলি।
এখন আমরা লাশ
আমাদের সকল সম্ভাবনা এখন পতিত রাজনীতি।

সবিতা ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

একদিন আমার কাছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা জানতে চেয়েছিল সবিতা
তখন ঘনঘোর কুয়াশায় ডুবেছিল আমার পৃথিবী। তখন একটা
শ্বেতশালিক বসেছিল আমার উঠোনে। নরম চিবুক ছুঁয়ে সামান্য কিছু
সময়ের জন্য সবিতারা আসে। পৌষের সকালের রোদের মতো। উষ্ণতার
অপেক্ষায় হারিয়ে যায় হাজার বছর। আবার কিছু কিছু ক্লান্তিতে ডুবে যায়
স্মৃতির উৎসব। অতঃপর সবিতার চোখে চোখ রেখে যেদিন প্রেমিকের হৃদয়
আবেগ শূন্য হবে। প্রেমিকার প্রেমের সব উচ্ছ্বাস হারিয়ে যাবে। সেদিন হয়তো
আবার দেশে দেশে গন্তব্যের ভিতর অথবা গন্তব্যের বাইরে তৃতীয় বিশ্বের
দেশগুলোতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা ছড়িয়ে পড়বে।