শিবলী মোকতাদিরের ৫ কবিতা
প্রকাশিত : মে ২৪, ২০১৯
গ্রাম্য পথে একদিন
সে তো আমিও দেখেছি, দিকে দিকে সরলতা
চৈত্রশাসিত গ্রামের পথে নেমে এলে ধানের কৌতুকে
সেথা উঁচু-নিচু শান্ত কৃষকের গভীরতা
তোমার জ্যোৎস্না কবলিত ভরা মাঠে
ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে।
দীর্ঘ রোগিনীর মতো তাদের আগামী সম্ভাবনা
সত্য-মিথ্যা আনাগোনা
জ্যামিতি খাতার ন্যায় প্রাপ্ত হয়ে আছে
যেন এক, একাধিক আমাদের কাছে।
তবুও নির্জনে তীব্র লাল মোরগের কোলাহলে হরেক সম্ভবে
যে বালক দূষিত ভাষায় কথা বলে; যুগের কৌশলে
বস্তুত দেখেছি সফল গ্রামের বাঁকে বাঁকে
বাধ্য আর বৈধ সব ভুলে গেলে—
মলিন দেশের চাঁদ কিছুটা বঙ্কিমরূপে ফুটে ওঠে।
বোন ও বনের গল্প
গণিতের দোষে এলে, এলে অবকাশে ছাত্রদল ঘুরে ঘুরে
মায়াবী মেঘের মাঝে মাঝে মাতাল ময়ূর মনে পড়ে, পড়েছিল...
কত বস্তু আর সংকেতে বাঁধা এই দেহ
বিধবা বোনের মতো।
তাকে আজ কোন ভূতে ধরিলো গাছের?
কোন বাঁকে, প্রবাহিত কোন চক্রে;
মোমের লজ্জায় ফেলে দিলো?
সমতলে তবু গাছ একদা প্রেমের সরোবরে
বৃষ্টি আর ব্যাকরণভেদী এই গাছ;
সমবেত ছায়ার আঘাতে জ্বলে ওঠা সবুজের এলোমেলো।
সেই থেকে কাল মহাকাল সন্দেহ করিনু তারে
সেথা কোন লোভে যাও বারে বারে!
সে তো আপেলের নয়, রসালো ফুলের কোন বনে
অবিরাম যেতে চাও;
এত যে পতন রুখে
আয়োজনে বিদেশি গাছের ডালে ডালে
খুনীর স্বরূপে এই বন তরলে তরলা;
ওগো গাছ! শ্রেণিহীন সরলের
বলে দাও—
কোন ভূতে ধরিলো গাছের হারানো বোনের তরে?
একটি জীবন
বহনে— ভারের ব্যাখ্যায় কী মত পোষণ করো তুমি?
জানতে, সাধুসন্তের সান্নিধ্য ছেড়ে
আজ আমি ফাল্গুনী রাতের বিবিধ কোলাহল থেকে দূরে
স্তবকের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে বসে আছি;
একা, ধর্মীয় অবতার রূপে।
চারপাশে আমার চিত্রিত তরল,
পক্ষে-বিপক্ষে নানান সব টালবাহানার বরেন্দ্রভাষার উপকথা
তাদের রাগ আর রাগিনী, বাদ আর বাবরির হুংকারে
ধুলোর বিচিত্রা হয়ে আছে প্রভূত অঞ্চল— মূলত এখন।
অথচ বাকলের ন্যায় গাছের গরবিনী হয়ে আছো
কণার কলঙ্ক হয়ে ডুবে আছো পদার্থে তুমি।
আয়ুর মধ্যে আয়োজন করা প্রাণ,
পারদ-তুল্য প্রেমিকার অভিমান
শুরুর সূচিতে, সমাপ্তির বিস্তারে আচ্ছাদিত হয়ে আছো
অতীব কৌশলে, বহনবাগিচায় ভিন্ন ভারের মুকুলিত ডালে;
পাতায়, প্রথাগত মুচকি হাসির তলে...
বিবাহের গুঞ্জনে
কত গান, কত কলি ও কথার আগমনে ভরা
গৃহটি তেমন তথা— বিবাহের ভারে আনকোরা
যত দিদি ও দাদার খানদানি শত চিৎকারে
বিষণ্ণ শাড়িতে খালা, খালু তার বসেছে আহারে
গন্ধে তুলে গতি এ-ঘরে ও-ঘরে নিত্য আসে যায়
আমাকেই খাদ্য করে হেসেখেলে কণ্ঠে ও লালায়
জরি আর জরোয়ায় যত তেজি আনাচে-কানাচে
ধরো হাতে হাত, আঁখিতে আঁখির প্রশ্নে তারা নাচে
গোলাপে আলাপ রেখে রাখে মন সূর্যমুখী ফুলে
ও-পলাশ কাঁটার কাহিনি শুনে গেঁথে রাখো চুলে
আমি তবে কোথায় নিযুক্ত সাঁই? কে আমাকে বাঁধে?
কোন মালা বালিকা সাজাও চাঁদ ওঠা দূর ছাদে
মাতা আর মাতামহী জাগে অচেনা ভাসুর, জায়ে
সাধু ও সন্ন্যাসী ধুম্র-সিক্ত-বালে— চলে চার পায়ে
ফলে বজ্রে ডাকা মেঘ, তাতে বৃষ্টিমাখা বর-কনে
বাহিরে ননদ কাঁদে আগাগোরা ছন্দে আনমনে
সেহেতু তৃণের বদলে ইস্পাতে রাখি অতিশয়
দাবির দহনে পোড়া এই দেহ, চিত্তে চড়ে ভয়
ধরণী পড়েছে ধরা ধর্মে-কর্মে, তবু এই রাতে
তুমি বাজো সানায়ের সুরে, কবি তার কলিজাতে।
জাত-পাত-বর্ণ নির্বিশেষে
জাতের প্রশ্ন চাপাও তুমি ক্ষেত্রে খেলার ছলে
ধর্মে-কর্মে-ফলে
শ্রেণির মধ্যে শোষণ ছাড়ো পদাধিকার বলে।
দূষণে হয় সুদৃঢ় সব বাক্যে বিস্তারিত
গোষ্ঠী-গোত্র প্রীত
আদির অন্তে সমস্ত ভুল কেন্দ্রে সঞ্চালিত।
সাম্যজ্ঞানে সুফি তুমি হিন্দু মুসলমান
সাধক-অন্ত প্রাণ
গানেই মারো চিন্তা-চেতন সুর-বাণীতে টান।
তুষ্ট করো উদ্ধৃতিকার ধীবর, চর্মকার
চণ্ডালিনী তার
মাধুকরীর রূপ সে গলে কাপালিকের হাড়।
এই আমাদের পাল-চন্দ্র, দেব-সেন-বর্মণ
উদ্ভাসিত মন
জীবন হাতে যুদ্ধ করা সহিষ্ণু কোন জন।
শূদ্র আমি অন্ত্যজে হই শঙ্করে সঙ্করা
বর্ণাশ্রমে যারা
উচ্চ থাকে ভোগের ভিড়ে, নিম্নে বসুন্ধরা।
কবি পরিচিতি: জন্ম ১১ জুন ১৯৬৯ বগুড়া। প্রকাশিত গ্রন্থ: ধানের রচনা দিলে পত্রে (কাব্যগ্রন্থ), ছন্দের নান্দনিক পাঠ (প্রবন্ধগ্রন্থ), নিষিদ্ধ পুষ্টির কোলাহল (কাব্যগ্রন্থ ), সোনার কার্তুজ (কাব্যগ্রন্থ), রৌদ্রবঞ্চিত লোক (মুক্তগদ্য), ব্যবহারিক বিস্ময় (কাব্যগ্রন্থ), দুর্ভিক্ষের রাতে (কাব্যগ্রন্থ), কায়া ও কৌতুকী (কাব্যগ্রন্থ) ও ছন্দকথা (প্রবন্ধগ্রন্থ)।























