শ্রেয়া চক্রবর্তীর ৫ কবিতা

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৯

হয়তো কেউ

মেয়েটি তোমাকে ভালোবেসেছিল
সে চেয়েছিল ভালোবাসো তুমি তাকেও

তুমি যখন তাকে আদর করে ডেকেছিলে কাছে
কানের লতির ওপর রাঙা হয়ে ফুটেছিল
লজ্জার দুকলি
মেয়েটি তোমাকে ভালোবেসেছিল আরও

যেদিন তার হাত ধরেছিলে, বলেছিলে,
‘চলো, সময় পেরিয়ে গেল বুঝি—’
সে তোমাকে বেসেছিল যতটা তুমি তাকে
তার চেয়েও বেশি

সময় কোথাও বুঝি ক্লান্ত ভালুকের মতো
ঝিম মেরে থাকে, সে উঠে দাঁড়ালো যেদিন
তুমি খুঁজে আনতে গেলে সীমানার অরণ্যে

তারপর এলে না অনেক দিন
মাতালের দল হুল্লোড় করে ফিরে যাওয়ার পর
মেয়েটি একা একা অন্ধকারে বুঝেছিল,
ক্ষুধার থেকেও বড় সত্য
বুঝি এই অপেক্ষা

ফিরে এলে একদিন, তারপরও
কোনো প্রশ্ন না করে সে তোমাকে এগিয়ে দিলো
স্নান মলম মাদুর ও আহ্লাদ
তবু মানুষ তুমি বোঝোনি সেদিনও
মরে যায় ক্লান্ত প্রবণতা একদিন
ব্যথাহীন চেতনার জলে

আবার খুঁজে না পেয়ে তোমায়
তোমার রমণীর সাথে চিরঅরণ্যে বিবশ জ্যোৎস্নায়
রেখে একা চলে গেল সে কোথায় কে জানে

ফিরে এসে আর পেলে না তাকে
হয়তো এবার ভালোবেসেছিল এমনি কেউ তাকে
যেমন সে বেসেছিল কেবল
কেবলই তোমাকে!

ভাষা

তোমাকে ভালোবাসার কোনো ভাষা নেই
নেই ঘৃণাবাসার
নেই আদরের ছুঁতে চাওয়ার আকুলতায়
পেরিয়ে গেল যে ট্রেন
তাকেই ঘড়ি ধরে মনে রাখার
নেই হননের নেই এক্ষুণি মরে যেতে চাওয়ার
মতো ইন্দ্রপতনের
মানুষের ভাষা শেখা হলো না যার আজও
সে জানে,
চোখ কখন ঝুঁকে পড়ে চোখের ওপর ঘনগোছা চুল
আঙুল কখন উদ্ধত হতে গিয়েও নুয়ে পড়ে বুকে
কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম কোন সে বিকেল
শরীর এমন কত কথা বলে!

সিঞ্চন

যদি না আমার অশ্রু গড়িয়ে যায় তোমার কাঁধের ওপর দিয়ে,
হে মানুষ, বলো তবে, ও কেমন ঢাল বানিয়েছো?
ভেজে না না যে হৃদয়ের অপরূপ মন্থনে—
যে কেবল নৈমিত্তিক শব্দ ফুঁড়ে জেগে উঠতে চায়
নীরবতা নেই যার কিছুমাত্র, নেই বেদনার লঘুভার
সে বৃক্ষ বৃহৎ হয় কেবল, বাড়ে না এতটুকু
ধীরে শোভিত হয় তার আশরীর ক্ষত
নীল ঘন, ঘন নীল সিঞ্চনে...

ব্যথা

বয়ে যেতে ইচ্ছে হয় আমারও। পারি না। চোখের তারায় কার মুখ ভাসে?
বন্ধু হতে জানে কম, খুব কম জন। বেশিটাই যে যার মেটাতে আসে।
জিজ্ঞেস করি নিজেকেও। স্খলন সুখের হয় যদি—

কী নেশা মেশানো তাতে জানি। পড়ে থাকি তবু কার হাত ধরে?
এসেছিল নিয়ে যেতে মাপা পথ,
ব্যথা ছাওয়া শরীর অবধি।

 

জিজ্ঞেস কোরো না

 

জিজ্ঞেস কোরো না কেমন আছি আমি
সারাদিন তোমার কথা মনে পড়েছে কিনা একবারও
কিংবা লাঞ্চে কি খেয়েছি এইসব খুঁটিনাটি
ফেরার ট্রেনে কেমন সে হাওয়া
কোন স্টেশনের মোহ ভেঙে যায় তাতে
বিপন্ন হকার ক্রমাগত হেঁকে চলে যায়
অবিন্যস্ত দূরে
রাস্তা পার হতে গিয়ে অসাবধানে
পড়ে গিয়েছিল বুঝি চাবির গোছা
যে আমাকে ফিরিয়ে আনে রোজ
অভ্যাসগত মোহে,

ফিরে এসে গা ধুয়েছিলাম কিনা
সেইসব সুঘ্রাত বিকেলের দোষে
কেউ এসেছিল কিনা দরজায়
ডিনার কখন শেষ হলো? তারপর?
কে কোথায় কত গভীর স্পর্শ করে
ফিরে গিয়েছিল জুয়াড়ির অভ্রান্ত নিশানায়
কত কত রাত এভাবেই কেটে যাচ্ছে অনাদরে
চাইলে একটা গোটা মানুষকে
গিলে নিতে পারি কিনা—

আমাকে জিজ্ঞেস কোরো না
কে তুমি? জানতে চাও, বলো, কোন অধিকারে?