শ্রেয়া চক্রবর্তীর ৫ কবিতা
প্রকাশিত : এপ্রিল ১৫, ২০১৯
নববর্ষ
শাওয়ারের জলে ধুয়ে যায় সব
শ্যাম্পুমাখা হাত তালুর ভেতর ঘষে ঘষে
ইচ্ছে করে উপড়ে আনি গতজীবনের স্মৃতি,
ওই ব্যথাটুকুই তো সব
সবশেষে মাথার ভেতর বহন করে চলা
অজস্র হোগলার বন!
সাবানের ফেনা ডলে ডলে
নাভি থেকে ঊরু অবধি বসে যাওয়া আলপথ
তছনছ করে দিতে চাই একদম,
এসবে আমার প্রয়োজন আছে কিছু? বলো?
মনে পড়ে সেদিনের কথা—
দেখোতো কপালে কি একখানা...
বলে ঝুঁকে এসেছিলে কাছে।
কপালে আঙুল ছোঁওয়ানো মাত্রই
কেঁপে উঠেছিলে কেন বুঝিনি তা,
শুধু অবাক হয়ে দেখেছিলাম কপালের কাছে
জোড়া ভ্রূকুঞ্চন আকস্মিক স্পর্শ লেগে
বদলে গিয়েছিল সন্ধ্যামণি রাগে...
তারপর হলুদ ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে গেছি রোজ
যাওয়া আসার পথে দেখেছি কেমন সব বদলে যায়
অনিয়মের আনাচে কানাচে
মেয়েটির সাথে ছেলেটিকে দেখে
আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো বৃক্ষলতার মতো
ভালো লাগে, দেখে ভালো লাগে, লাগে...
আমার এই ফিরে আসা কেন? কিংবা কোথায়?
পুনরায় তোমাকেই নিতে চাই বলে
বাথরুমে আলো জ্বালি ঘন ঘন
বয়স বাড়ছে বুঝি রৈখিক ভুলে?
একটি স্নান আমাকে ধুয়ে মুছে নতুন করে রাখে
একটি ঘুম আমাকে পয়লা তারিখ দেয়
জ্যেষ্ঠ আষাঢ়ে কিংবা মাঘে!
আবির
মুঠো ভরে এনেছিল রঙ
শরীর চুঁইয়ে স্পর্শ কবেকার প্রত্যঙ্গের
আশ বিজড়িত কন্দর্পের
ঘুম ভাঙিয়ে বলেছিল,
‘তুমি এমনিতেই রঙিন...’
তারপর দুজনে কতদিন বেরিয়ে পড়েছি একা
মোহগ্রস্ত সাপ সাপিনীর মতো
মণিতে ধারণ করেছি যাবতীয় শ্লাঘা
বন্দরের উষ্ণ নোনা জলে ভিজে
মনে হয়েছে এই বোধ হয়
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সঙ্গমকাল
বহু বছর পর ঘুম থেকে জেগে উঠে
বিছানায় দেখি খোলস ফেলে চলে গেছো তুমি,
পৃথিবীতে এত প্রাচীর গজিয়ে উঠেছে আজ
কোথায় খুঁজবো তোমায় কতদূর বলো?
এক একটি পদক্ষেপ ভুলে যেতে দেয় না আর
রক্তের ভেতর গুলে দিয়েছে কেউ
জীবন মথিত
কেবল এক সুনিবিড় লাল!
এসো হে
কাঠফাটা রোদ্দুরে এসো
এসো তৃষ্ণার আচমনে
আল্পসের ওপার থেকে
এসো হে উদগ্র অশ্বক্ষুরে
ধুলো ওড়াও, ওড়াও প্রবল
হোক পথ যত অন্ধকার
নগরীর পথে জমায়েত হোক
বিস্মিত মানুষের
তারপর বৃষ্টি নামুক
বজ্রবিদ্যুৎসহ তুমুল বিপ্লবের
কন্দর থেকে এসো।
শহরে লাগুক কার্ফু
যে যেখানে আছে সেঁধিয়ে যাক গৃহে অথবা গলিতে
`টু` শব্দটি না করে
ঘুমিয়ে পড়ুক মেয়ে
মাকে তুলে নিয়ে চলে যাবে চকিতে
যে দেবতা রুষ্ট হলে
তার গল্প শুনে...
সময় বাকি আছে এখনো সামান্য কিছু
এসো হে, যে আছো আমার অপেক্ষায়।
আমার মেয়ের প্রেমিক
জানি না কোথায় যাবে সে কতদূর
একদিন বড় হয়ে
কোন্ সে সূর্যাস্তের করিডোরে
কিংবা কোন অচিন রেস্তরাঁয় তার হাতে হাত রাখবে
অচেনা যুবক
কেমন তার রূপ আমার পুণর্জন্মের প্রেমিকের
কিভাবে রাখবে তার ভালোবাসার ইস্তাহার
চিঠি লিখবে কি?
কোন্ সে দেশ তার তবে? কি তার ধর্ম হবে?
কাঁটায় কাঁটায় ছড়িয়ে পড়বে কি মরিচের ফুল?
টেবিল থেকে পড়ে গিয়ে উলটে যাবে ধারাপাত
দেশে দেশে আগুন ছড়াবে? বিপ্লব হবে বুঝি?
দেখতে ইচ্ছে হয় তাকে
আমার পুনর্জন্মের প্রেমিক,
শ্লোগান উঠুক তবে জ্বলুক মশাল মূক সভ্যতার হাতে
লণ্ডভণ্ড হোক যত নদীমাতৃক শহর
যুদ্ধ হয় হোক
সকালের কাগজে লেখা হোক সেকথা সর্বনাশের
হোক যত গাঢ় অক্ষরে...
না দেখা সে ছেলে
হ্যাঁ, আমার মেয়েকেই ভালোবাসে...
কাছে-দূরের মেয়ে
মা বলে, বড় হোসনি এখনো
কেউ বলে বড় বড় ভাব
বন্ধুতা বলে কাঁধে রেখে মাথা
তুই একটা পাগল, যা ভাগ!
কেউ কেউ হাসে দেখে দূর থেকে
বলে, ভালোবাসা নিও তুমি গুণী
কেউ আবার করে চোখ গাঢ় এই দুরাশায়
বলে, ওকে আমি বহুদিন চিনি!
নাক উঁচু বেখাপ্পা বড় এক বেরসিক মেয়ে
দর কই আদরের পাশে
ওকে বড় ম্লান দেখি যেন গাছ নত
ফুলেতে রাখতে ঢেউ যে নয় সম্মত...
কেউ বলে যেটুকু চিনেছি ভাই
মেয়েটিকে লাগে বড় ভালো
নীরবতা ভাঙে যদি সে তার গভীর চোখে
দেখেছি সে নয় কিছু শুধু এক আলো
গন্ধ নয় বর্ণ নয় নেই তার অপার জোছনা কিছু
তবু এক আদিগন্ত মিল
যেন কোন পাখি তার ডানা মুড়ে বসেছিলো এতকাল
দূরে যার সুগন্ধিত শস্যরঙা ঝিল
ভালোবাসে যারা তারা বলে না অনেক কিছু
তবু দেখি লেখা থাকে শব্দে শব্দে প্রেম
আর যারা রেখে গেলো আসমুদ্র ছাই
তাদের চুমোয় ঢালি নীল শ্যাম্পেন
উড়তে উড়তে সে ফোয়ারা হয়ে যায় দূর
নেমে আসি নীচে ক্রমে নীচে
শুনি ধীরে, মাথা নীচু, অনেক কথার ভিড়ে
বলে কথা যে মানুষ আমার ভেতর!























