সঙ্গীতা দাশের বাঙ্লায়নে গুলজারের কবিতা
প্রকাশিত : মে ২৭, ২০১৯
পাহাড়ের আগুন
সোনালি লাল ঝিলমিলে আগুন দেখেছিলাম
তরতরিয়ে উঠে যাচ্ছে দূর পাহাড় চূড়ায়
জাফরানি ওড়না উড়িয়ে যুবতী যেন
খালি পায়ে ছুটেছিল
নিচের উপত্যকা থেকে প্রেমিকের ডাক শুনে।
তারপর দেখি
উঁচু দেবদারু বেয়ে উঠে গেল আগুন
ঝোড়ো হাওয়ায় দুলে দুলে ডেকে ফেরে সে
বরফের অন্তরে ঘুমিয়ে থাকা বসন্তকে:
`এসো, চুম্বন করো আমায়, আমি তৃষ্ণার্ত—`
যুবতীর পরদেশি প্রেমিক ফিরে এসেছিল
গোটা জরির কাজ করা সোনালি লাল আগুনের কাছে
এলো না কেউ
গাছ থেকে নিচে নেমে এলো যখন
নিভন্ত অবয়বে ছাই উড়ছিল কেবল।
থিম্পু-ভুটান (ফেরা)
গতবার যখন এসেছিলাম...
নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম
আর এই পাহাড় আমাকে বলেছিল,
উচ্চতায় এত খাটো রয়ে যাও কেন তোমরা?
আসো, হাত ধরো আমার...
আমার পাজরে পা রাখো, উপরে উঠে আসো...
আসো, তোমার অবয়বটুকু তো দেখি, কেমন দেখতে তোমায়?
আমার পিঁপড়েদেরকে যেমন তোমরা,
আলাদা আলাদা করে চিনতে পারো না
আমার কাছেও তোমাদের সব এক রকম লাগে।
একটাই মাত্র পার্থক্য—
আমার কোনো পিঁপড়ে যদি গায়ে উঠে আসে
দু আঙুলে তুলে ফেলে দাও,
পিষে মারো তোমরা।
আমি তা করি না!
আমার পাইনকে দেখো শূন্যের দিকে উঠে গেছে কতদূর!
তোমাদের উচ্চতার তুলনায় সাতগুণ তো হবে, দশ বারোগুণও হতে পারে
বয়স দেখো ওর, সহস্র বছর বেঁচে আছে।
বলতে হয়, তাই বলো
আসলে গুরুজনদের শ্রদ্ধা করো না তোমরা।
তোমরা যা ভাবো তেমন নিঃসঙ্গ নই আমি,
ভিড়ের মধ্যেও একা, সে তো তোমরা।
মরুযাত্রী মেঘের দল যখন এ পথ দিয়ে যায়,
আলিঙ্গন করে যায় আমায়।
নদীও যাবার সময় পা ছুঁয়ে বিদায় নেয়।
ঋতু আমার অতিথি, এলে কয়েক মাস কাটিয়ে যায়,
কালচক্রের বন্ধন মেটায় সে।
তোমাদের জীবনকাল লক্ষ্য করে দেখেছি...
কত ক্ষুদ্র কালসীমার মাঝে
বন্দি তোমাদের মিলন আর বিচ্ছেদ।
সাধ আর উচ্চাভিলাষগুলোও
ওই সময়সীমার মতো ক্ষুদ্র।
এইজন্যেই কি... তোমাদের কাঁধ এত খাটো রয়ে যায়?
পাহাড় থেকে ফিরি
পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ফিরি যখন
কয়েকদিন ধরে নামতে থাকি,
শূন্যে ঝুলে থাকি
কোথাও পা পড়ে না আমার!
অনেকখানি আকাশ বাসা বেঁধে থাকে কাঁধে
নিচে নামে না
ফুলে ফুলে ওঠে হাওয়া আমার পাজর ধরে
কখনো বগলদাবা করে তুলে নিয়ে যায় রাত
কখনো দিন এসে ঠেলে দেয় হাওয়ার ভিতর...
অনেক দিন অবধি আমার পা পড়ে না মাটিতে।
কবি পরিচিতি: সম্পূরণ সিং কালরা। পৃথিবী তাকে গুলজার নামে চেনে। শিখ-পরিবারে জন্মেছেন ১৯৩৬, মতান্তরে ১৯৩৪ সালের ১৮ আগস্ট দিনায় (ব্রিটিশ ভারতের ঝিলম জেলা, বর্তমানে যেটা পাকিস্তানে অবস্থিত)। দেশত্যাগের সময়ে তার পরিবারকে চলে আসতে হয় দিল্লির রওশন আরা বাগে। সেখানে ইউনাইটেড ক্রিশ্চিয়ান স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন শেষ করেন তিনি। বম্বের (মুম্বাই) খালসা কলেজ এবং ন্যাশনাল কলেজ কম্বেতে ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালীন বিদায় জানান প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়াকে। সাহিত্যের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা এবং অসীম ক্ষুধা তাকে ঈর্ষণীয় পাঠকে পরিণত করে। পরে চলচিত্রের বর্ণাঢ্য জগতে তার কৃতীয় অবদানের জন্যে সকলেই তাকে চেনেন কখনো গীতিকার, কখনো চিত্রনাট্য রচয়িতা, কখনো চলচ্চিত্র-নির্মাতা হিসেবে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে তিনি কবি গুলজার। কবিতায় যিনি প্রতিদিন বেঁচে ওঠেন– ভাব ও ভাবনার অনির্ণীত জগৎ যার কবিতার কোমল সংঘাতে পাঠকের কাছে উন্মোচিত হতে থাকে নব-নব রূপে। তা দুটি কবিতা অনুবাদ করেছেন তরুণ কবিত সঙ্গীতা দাশ।























