সানজিদা আমীর ইনিসীর ৫ কবিতা
প্রকাশিত : মার্চ ৩০, ২০১৯
উপক্রমণিকা
আমি প্রতারকের প্রতি স্নেহ এমনি করেই লুকায়ে রাখি ত্বকের নিচে
যতটুকু তার মা’র মতো অকৃত্রিম
যতটুকু তার কাছে খুব স্বাভাবিক
ততটুকু আমি দুই হাত দিয়ে আঁকড়ে রাখি
যেমন ধসে যায় পাহাড় ও পৃথিবী
তেমনই এই পৃথিবীর একান্ত রাত্তিরে ধসে গেছি আমি
সেইদিন আমি গাঁওগ্রামের প্রাচীন মাতম শুনছিলাম
শুনছিলাম তুমুল কান্না আর আওয়াজ ‘কেন হৃদয় খসে যাইতেছে’ ডাকে
ভেসে গেছে জরাজীর্ণ দেহের প্রেমবলয়ের টুকরো
ধ্বংসস্তূপের মতো মিলায়ে গেছে স্তন
আর কোমরের নিচ গলে শুরু হওয়া অন্ধকার রাত্তির— তার সিন্ধুর ঢেউ
এতসব ধূলিসাৎ হওয়ার পরেও কিছু আছে স্থান
বাতাস বয়ে গেছে যেখানে
সেখানে থেকে আমি গোপন গভীর প্রেম লুকায়েছি
কেবল আমি ভালোবাসি জন্য
আমি ভালোবাসি তাই
তার নিবন্ধ রাখা আছে আমার ত্বকেরও নিচে
যেমন ক্ষয়ে আছে তোমার প্রেমিক উপক্রমণিকা
তোমার ত্বকেরও নিচে
দ্বিধা
উজানগাঁ আর রাইখাল পার হইয়া সে আসে
সে আসে আমার ক্লান্ত ছায়ার মতো—
যেন আমি বইসা আছি একলা
এ পৃথিবীর ‘পরে স্থির কোনো অকুস্থলে
ফিইরা আসে কেন
কেন অতীত বৃত্তান্তের সমীরণ আবার গায়ে মাখা
কেন সে আমারেই বাসে ভালো
বা একান্তই বাসে না—
সে আমি জানি না
শতশতবার সে যেন এমনই আসে দূর দেশ হইতে
পিদিম নিইভা যাওয়া সন্ধ্যায়—
যেন এক লহমায় আমি তারেই দেখার জন্যি
ধূসর শরীরের সমস্ত অন্ধ আলিঙ্গন জমা রাখি মিছে অভিলাষে
সকল দুপুর আর তার আলো ফুরায়ে গেলেও
তবু চাই ঘোরঘন আঁধারে প্রতিবার প্রদোষে
মূর্ত হোক দ্বিধা—
‘ভালবাসে না সে আমারে
বা খুব করে বাসে’
আমি আর কোত্থাও চলে যেতে পারি না
অসম্ভব ঘৃণায় মুখ ফিরায়ে নিতে পারি না
এ ভালোবাসা ঘুণাক্ষরের মতো
দুই পায়ের কদম বেহিসেবে ফেলার গোস্তাকিতে আমি
তোমার বাড়ি পৌঁছে যাই,
পৌঁছে কী তীব্র উন্মত্ততায়
তোমাকে পুড়ে যেতে দেখি—
এ ভালোবাসা ঘুণাক্ষরের মতো
আমি কোনো সনেটের ওপর দাঁড়ায়ে
সূর্যকরোজ্জ্বল আগুনের পাশে দাঁড়ায়ে
অসম্ভব ঘেন্নায় মুখ ফিরায়ে আমি চলে যেতে পারি না
চারপাশে কেমন হয়ে আবলুস মত্ততা আছে ছড়ায়ে
তুমি না শুধু, পুড়ে ছাই হয়ে আসছে আরও অনেকে
অপরাহ্নের আলোতে তোমার মুখ আরও একবার দেখবার অভিপ্রায়ে
গূঢ় কত বাসনার মানুষ কিভাবে শেষাবধি
মুখ ফিরায়ে লয়ে যায় ভেবে—
আমি আর কোত্থাও চলে যেতে পারি না
খোয়াবনামা
মন জঙ্গলের পথে
সহজে গুঁড়ায়ে যাইতেছি
অনাবাদী বাতাসের সাথে
তারপর
কত-পর
আমাদের ছোট ডিঙি
তার বিস্তৃত জীবন
চলতেছে
আমাদের বাঁকে বাঁকে
ছোট জীবন— আরও জড়ায়ে
আরও-আরও জড়ায়ে একা হইয়া থাকলে
বহু বীথি সে পার হইয়া যাবে
আমরা
শুধু আমরা থাকব
নিরন্তর মাছেদের সাথে
ডাঙায় উজায়ে ঘাসেদের সাথে
মাছের আঁশটে গন্ধ মুখে নিয়া শরীর বাইয়া বাইয়া ক্লিভেজে জমা থাকবা তুমি
আর
কিছু তুমি গড়ায়ে নাভি উপকূলে
স্নানেরও আগে
আরও একবার
সকালে উইঠা এক উদ্দাম ঘাড়
সৌষ্ঠবহীন আঁচল সরায়ে পাহাড়ের মত ঢেউঢেউ কম্প্র—
তোমার জন্য লাগাতার সমান্তরাল
হইতে থাকলে—
বুকে আইসা
যেন দরিয়া
তার কলকল শব্দের মধ্যে
মাথা রাইখা ঘুমায়ে পইড়ো তুমি
এইসব শান্তির ঘুমের
খেইহারা দিনে
উত্তাল উপকূল থেকে
ডিঙি কি চইলা যাবে সাদা বকের গ্রামে?
সমুদ্র-হাবেলি
আঁটসাঁট ঘেরাও জামাকাপড় শরীর কামড়ে ধরলে
পা’র পাতা থেকে শন-মতো চুল
নিয়ম আত্মস্থ করে-করে অবশ হয়ে যায়
ধুমধাম আমি আমারে পার কইরা যাই
বাকি কয়েকজন, এরাও ঘেরাও কইরা আছে আমাকে
তাদের মতো কনভেনশনাল কেউ হইয়া উঠতে থাকি আমি।
মনে পড়ে— একটা স্বপ্ন কয়েকরাতে
আমি একা একা ভাবছিলাম আর
দেখার চেষ্টা করছিলাম
আমার আর কিছুই নাই
অশান্তি-শান্তি
উদ্বিগ্নতা-অস্থিরতা
কয়েকটা সমুদ্র একসঙ্গে মিইশা গিয়া
বড় না, বরং
ছোট একটা সমুদ্র হইয়া আছে
বৈরিতা নাই
ব্যস্ততা নাই
আমার ঘর নাই
ঘর বানানোর কাজ মুলতবি রাইখা
সমুদ্র সাম-রাজ্যে বইসা থাকি
ঘুমাইয়া কাঁদি
যখন
দিনে একবার আলোরা বাঁকা হইয়া ঝিমায়
পৃথিবীতে না-থাকা আর থাকা দুইটাকেই খোশ বইলা জানায় সমুদ্র
আমি তারে বিশ্বাস করি
কত বেলাবসান হয়
আহ্বান নাই
ঘর নাই
শান্তি বা অশান্তিও নাই।























