করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৫৪৪২৩৮ ১৫০৩১০৬ ২৭২৫১
বিশ্বব্যাপী ২২৯৪৮৮৩৫৭ ২০৬১৪৪৭২২ ৪৭০৮২৭৮
অলঙ্করণ: রিফাত বিন সালাম

অলঙ্করণ: রিফাত বিন সালাম

ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ে বিশ্বতাত্ত্বিক যুক্তি

আমিনুল ইসলাম

প্রকাশিত : আগস্ট ৩১, ২০২১

জগতের স্রষ্টা ও নিয়ন্তা একজন আছেন, এ বিশ্বাস অনেক বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের মনেই বদ্ধমূল। তাদের কেউ কেউ ঈশ্বরের অস্তিত্বকে সরল বিশ্বাসে মেনে নেন, আবার অন্য কেউ সেই বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান যুক্তিপ্রমাণের ওপর। ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের লক্ষ্যে উপস্থিাপিত প্রধান প্রধান যুক্তিকে চারটি শিরোনামে আলোচনা করা যেতে পারে। এগুলো হলো, বিশ্বতাত্ত্বিক যুক্তি, উদ্দেশ্যবাদী যুক্তি, নৈতিক যুক্তি ও তত্ত্ববিয়সক যুক্তি। এখানে বিশ্বতাত্ত্বিক যুক্তি আলোচনা করা হলো:

মুসলিশ দর্শনের ইতিহাসে আল ফারাবি (৮৭০-৯৫০) এবং পাশ্চাত্য দর্শনের টমাস একুইনাস (১২২৪-১২৭৪) এ যুক্তি প্রয়োগের জন্যে বিখ্যাত। আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণে ফারাবির দেয়া কয়েকটি যুক্তির মধ্যে কারণিক যুক্তিটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফারাবি বলেন, কারণ ছাড়া কোনও কাজ বা ঘটনার উৎপত্তি সম্ভব নয়। জগতের প্রতিটি বস্তু ও ঘটনার মূলে যেমন একটি কারণ থাকে, তেমনই জগতের সৃষ্টি ও অস্তিত্বের মূলেও একটি কারণ থাকা চাই। কারণ ছাড়া কোনও কাজই সম্ভব নয়। তবে কাজ ও কারণের এই অনুক্রম সীমাহীনভাবে চলতে পারে না। আমরা তা ভাবতেও পারি না। আর যা ভাবা যায় না, তা সম্ভবও নয়। সুতরাং, কার্যকারণ অনুক্রমের মূলে অবশ্যই এমন একটি অকারণিক কারণ থাকবেই। আর সেই কারণ হলেন আল্লাহ।

আল্লাহই জগতের আদিকারণ, এবং সেই সূত্রেই তিনি জগতের অতীত, বিকারহীন ও পূর্ণস্বভাব। একই যুক্তি দিয়েছিলেন টমাস একুইনাস। তার মতে, কার্যকারণ অনুক্রম অনুসরণ করতে গিয়ে শেষপর্যন্ত এমন একটি কারণ স্বীকার করতেই হয়, যা নিজে সব কাজের কারণ, অথচ তার নিজের কোনও কারণ নেই। আর সব কারণের এই আদিকারণই ঈশ্বর।

ফারাবির দেয়া আরেক যে যুক্তির সঙ্গে একুইনাসের যুক্তির মিল রয়েছে, তা প্রতিষ্ঠিত আবশ্যিক ও শর্তাধীন সত্তার পার্থক্যেও ওপর। আবশ্যিক সত্তা বলতে এমন একটি সত্তাকে বোঝায়, যা নিঃশর্ত ও অনিবার্যভাবে বিদ্যমান। যা তার অস্তিত্বের জন্য অন্য কারও সত্তার ওপর নির্ভর করে না। এবং যার অনস্তিত্ব চিন্তা করা যায় না। অপরপক্ষে, শর্তাধীন বা সাপেক্ষ সত্তা বলতে এমন সত্তাকে বোঝায়, যা তার অস্তিত্বের জন্যে অন্য কোনও সত্তার ওপর নির্ভরশীল, এবং যার অনস্তিত্বের কথা ভাবা সম্ভব। যেমন, এ জগৎ কোনোদিন না-ও থাকতে পারত, কিংবা ভবিষ্যতে না থাকতে পাওে, এমন কথা ভাবা অসম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে জগৎ আছে, এবং তার এই অস্তিত্ব নির্ভরশীল অন্য কোনও সত্তার ওপর, তার নিজের ওপর নয়। জগতের কারণ সেই সত্তা নিজেও এভাবে অন্য কোনও কারণের ওপর নির্ভরশীল হতে পাওে, আর তা যদি হয়েই থাকে তাহলে সেই কারণও অন্য কোনও কারণের ওপর নির্ভরশীল। এভাবে এক সত্তার অন্য সত্তার ওপর নির্ভরশীলতায় যে অনুক্রম তা সীমাহীনভাবে চলতে পারে না। আর তা নয় বলেই আমাদেও ভাবতে হয় এমন এক নিঃশর্ত, অনপেক্ষ ও আবিশ্যিক সত্তার কথা, যার অনস্তিত্ব অসম্ভব। এবং যার অস্তিত্বের প্রমাণ নিহিত থাকে তার ধারণার মধ্যেই। প্রাণ, জ্ঞান, অন্তর্দৃষ্টি, ইচ্ছা, শক্তি, সৌন্দর্য প্রভৃতি গুণের আধার এই স্বয়ং-অস্তিত্বশীল অনিবার্য সত্তাই হলেন আল্লাহ।

এ যুক্তিতে ধরে নেয়া হয় যে, প্রত্যেক ঘটনার অবশ্যই একটা কারণ আছে। কিন্তু আদিকারণ ঈশ্বরের কোনও কারণ নেই। সবকিছুর কারণ আছে, অথচ আদিকারণের কোনও কারণ নেই- এ দাবির যুক্তিযুক্ততাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে বিভিন্নভাবে। ডেভিড হিউম ও অন্যান্য কোনও কোনও সমালোচক প্রশ্ন তুলেছেন, আদিকারণের কারণ কী? যদি প্রত্যেক ঘটনার কারণ থাকতে পারে, তাহলে ঈশ্বরে গিয়ে আমরা থেমে যাব এবং ভিন্নমত পোষণ করব কেন? আদিকারণ হিসেবে ঈশ্বরকে যদি স্বকারণিত কারণ বলে স্বীকার করা যায়, তাহলে একই যুক্তিতে জগৎকে স্বকারণিত ভাবতে বাধা কোথায়? ঈশ্বর যদি অনন্ত ও শাশ্বত হতে পারেন, তাহলে একইভাবে বিশ্বজগৎ অনন্ত ও শাশ্বত হতে পারবে না কে?

সমালোচকরা অ্যারিস্টটল ও একুইনাসের অনবস্থা দোষ যুক্তির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের প্রশ্ন, প্রত্যেক কার্যের একটি কারণ আছে। সেই কারণেরও একটা কারণ আছে। এভাবে অনির্দিষ্টের দিকে অগ্রসর হতে বাধা কোথায়? কার্যকারণের এ অনুক্রম কোথায় গিয়ে থামবে, কিংবা আদৌ না-থেমে সীমাহীনভাবে চলতে থাকবে কীনা, এসব প্রশ্নের সঠিক সুনিশ্চিত জবাব কারও জানা নেই। এমনও তো হতে পারে, এ বিশ্বব্রক্ষ্মা-ও একটি ধারাবাহিক বৃত্ত স্বরূপ, এবং তা অনন্তকাল ধরেই এভাবে আছে। এ ভাবনা আদৌ অযৌক্তিক নয়।
এছাড়া আদিকারণের ধারণাকে মেনে নিলেও সেই কারণ যে ঈশ্বরকেই হতে হবে, এমন কথা নিশ্চিত করে বলব কী করে? যেমন গ্রীক পরমাণুবাদী দার্শনিক ডেমোক্রিটাস প্রশ্ন করেছিলেন, জড়, শক্তি ও স্থান (স্পেস) কি আদিকারণ হতে পারে না? পৃথিবীর আদিকারণ যে এক ও অদ্বিতীয় হবেই হবে, এ নিশ্চিত ঘোষণা আমরা দেব কীসের ভিত্তিতে? এমনও তো হতে পারে, আসলে আদিকারণ এক নয়, একাধিক। পরিশেষে আমরা কি একথা বলতে পারি না যে, জগতের প্রত্যেক জিনিসেরই একটা কারণ আছে, এবং সেই কারণেরও একটা কারণ আছে। তাই যদি হয়, তাহলে কার্য ও কারণের ধারা অবিরাম ও অনির্দিষ্টভাবে চলতেই থাকবে, যার ফলে আর আদিকারণে বিশ্বাসের প্রশ্নই উঠবে না।

আমিনুল ইসলামের ‘জগৎ জীবন দর্শন’ বই থেকে পুনর্মুদ্রণ করা হলো