আকরাম খানের ৩ কবিতা

প্রকাশিত : জুলাই ২২, ২০১৯

দুঃস্থ শিল্পীর আর্তি

আমাকে বেকার ভাতা দেয়া হোক অথবা বয়স্ক,
নেয়া হোক বৃদ্ধাশ্রমে, আপত্তি নাই চালান দিলে হাজতে
বিখ্যাত কত ব্যক্তিই তো জেলখানার মেহমান হয়েছে।
লুজ সিট হয়ে খসে যেতে চাই না এই শহরের ফুটপাতে,
দুঃস্বপ্ন দেখে নানা মাপের সেন্ডেল-জুতা-হিলের তল
থেকে প্রায়ই জেগে উঠি ঘর্মাক্ত।
আমাকে নারী, আদিবাসী নয়তো মুক্তিযোদ্ধা কোটায়
সামিল করা হোক
সম্মানিত পরিসংখ্যানবিদ যে কোনো সুবিধাবঞ্চিত খাতে
আমাকে রাখা হোক টুকে।
অচল মুদ্রা হয়ে থাকতে চাই না ঠাসাঠাসি করে
প্রাক্তন পয়সাদের সাথে সৌখিন কিশোরের টিনের কৌটায়।

শিল্পে চিরা ভেজে না আর
কবিতারে কাটে ইঁদুরে
আবর্জনার ঝুড়ি থেকে সাহিত্য চলে গেছে ময়লার গাড়িতে।

প্রাচীরেরও নাকি আছে কর্ণ।
দেয়ালের মাননীয় কানেরা,
নোটবুকে সন্দেহভাজনদের তালিকা থেকে আমাকে মুছে ফেলা হোক।
বিশ্বাস করেন,
যে কোনো আকারের খোপে নিশ্চিত এঁটে যাব
যদি থাকে বরাদ্দ,
বৌ বাচ্চা নিয়ে টিকে থাকাই এখন একমাত্র আরাধ্য।

ঈদের অফরমায়েশি কবিতা

লাল পাঞ্জাবি পরে বেড়িয়েছিলাম
বিপ্লবী ঈদ উদযাপনে।
পাঞ্জাবির দুই দিকে পকেটের বদলে ছিল
জাদুর দুই থলে।
হাত দিতেই বের হয়ে আসছিল
চকচকে থোকা থোকা নোট!
আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছিলাম সালামি-বকশিস্!
রিকশাঅলা, মুটে-মজুর, গার্মেন্টস শ্রমিক,
ছানিপরা ফোকলা দাঁতের যত মুসাফির
শূন্য থেকে লুফে নিচ্ছিল, রাস্তা থেকে কুড়াচ্ছিল
মুজিবের ছাপ মারা অফুরান নজরানা।
রূপার অতল ডেকচিগুলো থেকে উপচে পড়ছিল জাফরানে রাঙানো জর্দা
আর পেস্তা বাদাম দেয়া সেমাই।
ধানমন্ডি, গুলশান, বনানীর মার্বেল পাথরের
বারান্দাগুলো থেকে পলিশ করা মুখের
আসল ফকিররা চোখ বড় বড় করে দেখছিল
শহরে নবাগত এই খাঁটি আমিরের ভেলকি।

আতশবাজির হৈ-হট্টগোলে চাঁদরাতে
ছাপোষা কাঁচা ঘুম আমার হায়, কেচে গেল!

শহরে ফাগুনের রাত

সফেদ পাখায় উড়া দেবশিশুরা ধনুক তাক করে থাকে
সর্বস্ব লুট করা তীরে নাজুক হৃদয়দের
বিদ্ধ করার প্রতিক্ষায়।
ভোজবাজির মতো ফুস করে সূর্য নিভে গেলে
পাড়ায়, মহল্লায়, অলি-গলি রাস্তায় জ্বলে ওঠে
লাল নীল হলুদ সবুজ বাতি।
অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়ানো যুবক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফুটপাতে,
কমলা আগুন জ্বলা মোমবাতির মতো মায়াবী যুবতী
দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মুখ ফিরায়
চিকচিক করে তার চোখ,
চিবুক গড়িয়ে নিরুদ্দেশ হবার আগেই
লুফে নেই দুর্লভ রত্নরাজি।

অন্য কোনো মঞ্চে অথবা ময়দানে
যেন অকস্মাৎ দুঃসংবাদে বসে পরে ধীরে তরুণী,
বিহ্বল তরুণ এদিক ওদিক তাকায়।

সরে যাই।
নিয়ন আলোয় সাঁতরাতে সাঁতরাতে পেয়ে যাই
কাঙ্ক্ষিত যুগল,
কুয়াশায় পিছলে পরা নীল আলোয়
একে অপরের ঠোঁটে রাখে ঠোঁট
শুষে নেয় পরস্পরের উষ্ণ হৃদয়,
বুজে আসে দুই জোড়া চোখ
শূন্যে উঠে যায় তাদের পায়ের পাতা।
আকাশে খসে পরে তারা
আলোক ছটা হয়ে উড়ে যায় একঝাঁক পায়রা,
জাদুকর জানায় টুপি খোলা অভিবাদন
নানা রঙের রুমাল টুপি থেকে বের হয় অফুরান,
আর আমার হাতে উঠে আসে হরতনের সাহেব
জ্বলে ওঠে ইস্কাবনের বিবি।