আফসানা বেলার দশটি কবিতা
প্রকাশিত : জুলাই ০৭, ২০১৯
আফসানা বেলা ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী। এক স্নিগ্ধ সহজতা আছে তার কবিতায়। কথোপকথনের ভঙ্গিকে খুব সহজাত দক্ষতায় কাব্যে পরিণত করতে পারেন তিনি। আবেগের এক সুমিত প্রকাশ আছে; আতিশায্য নাই কিন্তু তার মান্দ্র উচ্চারণের ভেতরে অন্তঃসলীলা প্রবাহের মতো আছে আবেগের গতিমান প্রবাহ। কাব্যে সহজ ও হৃদয়গ্রাহী উচ্চারণে অভিজ্ঞতাকে, কাল্পনিক বা বাস্তব, ধরতে চান তিনি। তার কবিতাগুলো ঝিরিঝিরি হাওয়ার মতো বুকের উপর দিয়ে বয়ে যায়। মানুষের যৌবন বা তারুণ্যের সুখময় ও আকুল স্মৃতি যা প্রায়শই বিস্মৃত হয় দৈনন্দিনতার মালিন্যে, তাকে তিনি স্মরণের সৌরভ ও সত্তার ঘ্রাণ দিয়ে ফিরিয়ে আনেন ভাষা ও বাসনায়, আর তাকে জারিত করেন সবার ললিত অভিজ্ঞতায়।
সে
একুশ কী এক কম হবে তখন
তার চোখজুড়ে ছলকে উঠত অন্তর্দৃষ্টি
তবে চোখ তার ডুমুড়ের ফুল
মাঝে মাঝে দেখা যেত
ঝুঁকে থাকতো নিচে, তার
জুতোর ডগায়।
আর ভাবত, জোড়া ভুরুতে খেলত টনটনে ভাঁজ
সে কি মার্ক্স নিয়ে ভাবত?
নাহ, তখনো সে মার্ক্স পড়েনি জিবরান আর টলস্টয় পড়েছে।
সে ফিতেযুক্ত জুতো পড়ত না।
আমাকে টেনেছিল তার অন্তর্মুখী স্বভাবটি
দুপুরের রাস্তাটি।
তার ঝরেপড়া ঘামটুকু চিবুকের কাছাকাছি এসে থেমে যেত
মানুষ এখন বড্ড বেশি প্রকাশমুখর।
তাকে শেষ দেখেছিলাম বিষ্ণু দে’র `ঘোড়সওয়ার` নিয়ে।
শহরের বিখ্যাত কফিশপে সে আর কফির অর্ডার দেয় না, যেখানে আমাদের বসা হতো প্রায়।
তবুও সে এ শহরের কেউ একজন
তার বহু ব্যবহৃত হাতঘড়িটি ভেঙেছিল এই রাস্তায়, হ্যাঁ ঠিক এই জায়গাটিতে
যেখানে দাঁড়িয়ে আমি আজ ৫২ বছর পর,
কলেজের ম্যাগাজিনে সেদিন তার লেখাটি ছাপা হয়নি,
তবুও সে হারিয়ে যায়নি।
এই পথের সাথে হাজার পথের মিলন যেখানে, তার কোথাও রয়ে গেছে সে
পথ কখনো পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না, তাই—
শহর কখনো দুটো হয় না।
শুনেছি প্রত্যার্বতন স্বাভাবিক নিয়ম
আর্বতিত হয়ে সে আবার এ শহরে ফিরে আসবে না
তার স্বপ্নের একবিংশ শতাব্দীতে?
জানি, এ রাস্তার বয়স বেড়েছে, সে আছে সেই একুশ কিংবা এক কম
তাকে এই শহরের প্রয়োজন আছে
তার নির্লিপ্ত ভঙ্গির জন্য, চোখের জন্য, তার ঘামের বিন্দুর জন্যে,
তরঙ্গায়িত চুলের জন্য, মুছে ফেলা তার সেই লেখাটির জন্য।
সে কি পরে মার্ক্স পড়ে নিয়েছিল?
এ শহরের বুকপকেটে
এ শহরের বুকপকেটে পয়সার শব্দ বাজে
বাদুরের সরণিতে হেঁটে চলে রাত, অন্ধ চোখে
চেতনার পাখনায় ভর করে আসে থতমত বুক।
ডাঙুলি হেরেছে দান সব
কুয়াশায় ঢেকে রয় শব
ডাহুকের লাল চোখে বেঁধেছি বাসা
খুঁজেছি চিল সমগ্র সন্ধ্যায়
ব্যথারা খুলেছে চুল দর্পনে ঊনকোটিবার
আর নীলাভ কালো আর্তনাদে
বৃষ্টিগুলো ভিজে যায় বারবার।
তুমি কালবেলা, আমি প্রথম আলো
আমাদের ঘরটা আমাদের মতো উদাসীন হবে
মাঝামাঝি একটা কমদামি দোলনা
তার দু’পাশে সুতোয় টানানো একগুচ্ছ কাগজের নৌকা।
দোতলার ছাদে কোনো চিলেকোঠার দরকার নেই
সন্ধেবেলায় জোনাকি এসেও ভিড় ঠেলবে না পায়ে
পুরো ছাদজুড়ে থাকবে শুধু
অস্তিত্ব বিলীনকারী নগরীর অন্ধকার।
তুমি বলেছিলে, অন্ধকারে অনেককাল তাকিয়ে থাকলে আলো দেখা যায়।
বছর সাতেক পর চাকরিটা ছেড়ে দেব
মাঝে মাঝে দূর থেকে অঞ্জন দত্ত শুনব
তার গান একটু দূর থেকেই ভালো লাগে।
আর তুমি তোমার বই লেখাটা শেষ করো
মলাটটি প্রথম আমায় দেখিও।
সেই সময়টার আর বাকিটা তোমার কথামতোই হবে
ইতিমধ্যে আমি বুকশেলফে নতুন কিছু বইও এনে রেখেছি
মিশেল ফুকো, জেমসন, মার্কেজ এবং আরো গুটিকয়েক।
তোমার উপন্যাস পড়ার ধৈর্য নেই
এবার কিন্তু পড়তেই হবে
বাজি ধরেছ
তুমি কালবেলা, আমি প্রথম আলো।
প্রিয়তমেষু
প্রিয়তমেষু,
খুব ভালো আছো?
জানি দেনা-পাওনা সব চুকে গেছে
ভেতরে ভেতরে
কেমন থাকা হয় জানতে চাওয়াটাও এখন ব্যক্তিগত ঠেকে।
ভনিতা রেখে আমার হঠাৎ আবির্ভাবের কারণ বলি,
কাল তোমার ফেলে যাওয়া সেগুন কাঠের আলমাড়িতে কয়েকটা চিঠি চোখে পড়ল।
একটু সংকোচেই হাতে তুলে নিলাম।
বিশ্বাস করো, কোনো তদারকির ইচ্ছে নিয়ে নয়
একটা সময় ছিল সংকোচের কোনো চিহ্ন ছিল না দুজনের কোনো ব্যাপারেই।
একবার তোমার শুভ্র শার্টটা শখবশত পরতে যেয়ে
তোমার অনুমতি চেয়েছিলাম বলে
সে কী রাগ তোমার!
বলেছিলে, ‘এক হতে পারিনি মানবী?’
কানে বাজে সে কথা।
যাই হোক, চিঠিগুলো দেখে তোমার একটা কথা মনে পড়েছে, আবদারই বলা চলে।
যেদিন দুজনার স্বীকারোক্তি হলো, অনেক কথার মাঝে বলেছিলে,
কখনো তোমাকে একটা চিঠি লিখতে।
আমি রাজ্যের আশ্চর্য মেখে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি তো কাছেই থাকবে, চিঠি পাঠাবো কি করে?’
বলেছিলে, ‘তোমার চিঠি পাওয়ার জন্যে গেলাম না-হয় দূরে...’
সেদিন কথাটার ভিন্ন অর্থ ছিল
আজকের মতো নয়।
আমি প্রায় প্রতিদিনই গুছিয়েছি কি কি লিখব
ভেবে রেখেছিলাম, তোমার অন্যমনস্ক হয়ে কলেজের সিঁড়ি দিয়ে ওঠে যাওয়ার কথা বলব
যেদিন আমি প্রথম বুঝেছিলাম তোমাকে
যদিও অনেকবার দেখা হয়েছে তার আগে
তোমাতে আমাতে
তবে সেদিনের মতো নয়, আর কখনোই নয়।
চিঠিতে জানতে চাইতাম, কী ভাবছিলে সেদিন?
তারপর সেদিন যে ইস্কাটনের ফাঁকা রোড দিয়ে যাচ্ছিলে, নীল শার্ট গায়ে
তোমার বাম পাশে কৃষ্ণচূড়া মাতাল ছিল
তোমার নীল আর ওদের লাল মিলেমিশে পৃথিবী গুম হয়ে গিয়েছিল
তুমি দেখোনি, আমি জেনেছিলাম।
তোমায় মাঝে মাঝে নীল বলে ডাকতাম
তোমার পছন্দ ছিল না; বলতে, ‘নীল মানে তো শূন্য!’
শূন্য থেকেই যে আমার শুরু ছিল, বোঝাতে পারিনি।
একদিন আমায় দেখে তুমি রিকশা থামাতে বলেছিলে,
যেখানে মাঝে মাঝেই তুমি ভুল গলিতে চলে যেতে
কী ভুলো মন তোমার!
আমি একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলাম বটে
এতটা আশা করিনি তাই।
তুমিও হয়তো জানতে না তখন কেন থেমেছিলে
তারপর লেখার ছিল, তোমার ওই...
জানি, সময়ের খুব দাম তোমার এখন
তাছাড়া, এই চিঠি তোমার সেই আবদারের চিঠি নয়।
শুধু একটা কৌতূহল আর কি...
তুমি কি আমার একটা চিঠি পাওয়ার জন্য দূরে আছ...
কখনো হাতে পেলে, যদি না ঠিকানা ভুল হয়, ফিরে আসবে?
বিশ্বাস করো, আবদার করছি না,
শুধু জানতে চাইলাম, এই ছাইরঙা চিঠির ডাগর বেদনা তো আমিও একদিন ভুলে যাব।
আমি নেই অথবা তুমি নেই
তোমার বন্ধু আহসান জানে, ড্রাইভার জুয়েল জানে
কিছুদিন পর তোমার মা জানবে
আর আমাদের কাবিননামাও তো সাক্ষী...
তার চেয়ে বড় কথা...
তুমি প্রতি মাসে আমায় হাত খরচের টাকা দাও
সুতরাং, তুমি আমায় ভালোবাসো।
তুমি উত্তর-দক্ষিণের জ্ঞান জানো
প্রজ্ঞার নতুন উন্মেষণা খোঁজো
জিবরান ও নেরুদা জানো
গাইতে জানো, ‘তোমার তুলনা আমি খুঁজি না কখনো বহু ব্যবহার করা কোনো উপমায়`
তার চেয়ে বড় কথা প্রতিদিন প্রমাণ করতে জানো কত ভালোবাসো
সুতরাং, তুমি আমায় ভালোবাসো
আমার প্রমাণের প্রয়াস নেই
অন্তরভেদী একজোড়া ভালোবাসার প্রলাপ নেই।
জ্ঞানের যে দীপ্তি খোঁজো আমার মাঝে
অবহেলায় পড়ে রয় সেও চোখের সালিশে
প্রার্থনায় অনুরণিত `তুমি` ছাড়া কিছু নেই
তারচেয়েও বড় কথা প্রিয়, প্রতিদিন প্রমাণ করতে জানো
আমার ভালোবাসা নেই
সুতরাং...
হয়তো শেষপর্যন্ত আমি নেই অথবা তুমি নেই।
মোয়াজ্জিন
মোয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনিও মিলিয়ে যায় দূরে
সব ভাবনাই কি শেষ হয়ে যায় মরণের সাথে?
যা টিকে যায় সময়ের নিয়ম অবহেলা করে...
এমন কি কথা আছে যা আওড়াবে কেয়ামতের ময়দানের `পরে
এমন সত্যবাণী যে আলিঙ্গন করতে চায় প্রজ্ঞার জগতে
সৃষ্টিকর্তা, `কাবিল` বানাও তারে।
এসো
হাদিসের ঘটনাক্রমে জেনেছি, তুমি আর আমি নাকি ভূষণের মতো
তবে এসো ঢেকে রাখি দুজন দুজনকে লজ্জা হয়ে, শালীনতা হয়ে
জেনেবুঝে গোপন করি দোষ-ত্রুটি সব।
পৃথিবী যখন ছিটাবে ধুলো পৃথিবীর নিয়মে
দোয়ার মতন দৃঢ় যেন হই— এসো, ঢাল হয়ে রক্ষা করি তাৎপর্যের খাতিরে।
যখন দাঁড়িয়ে যাব অন্যায়ের সাথে ভুল কোনো মোহে
শাসক হয়ে যেন সম্মুখে দাঁড়াই বিগলিত শ্রদ্ধা নিয়ে সাথে।
চলো আহ্বান হয়ে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হই অক্ষরে অক্ষরে
নির্ভর করি ভাষার মতো এবং ভাষাহীনতার মতো
এসো আলিঙ্গন হয়ে যাই
সত্যতম লক্ষ্যের চিবুকের ভাঁজে
কণ্ঠের তেলাওয়াত কর্ণে ভেদ করে যেমন চক্ষু বুজে যায়
আবেশের বশে। এসো, মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত করি একে অপরকে।
একদিন ছিল, আর আর নেই
তোমাকে পিষে ফেলতে চাইবে কেউ সুনীলের পাতায় পাতায়
গভীর মনযোগে অঙ্ক কষার খাতায়
ইয়ার ফোনে জায়গা বদল হবে তোমার কণ্ঠ
হারিয়ে যাবে আড়চোখ, রাস্তার সীমানা, গলির দালান
চাপা পড়ে যাবে তুমি পুরনো ঘুণে ধরা বইয়ে, ভাঙা শো-পিস, তাকের ধুলোয় কিংবা ভাতের থালায়
ক`দিন আগেও যে দীর্ঘশ্বাস করে রাখতো তোমায় কফির চুমুকে চুমুকে
সেও ভুলে যাবে, যাবেই যাবে তুমি শুধু মনে রবে ইতিহাসের সেই ‘ভুলে যাওয়া প্রাণী’ হয়ে
যে একদিন ছিল, আর আর নেই।
বিসর্জন
আধখোলা শেকলের রং-তামাশা ঢেকুর তুলে জানায়, তৃপ্ত হলো কাজ, সেরেছে সকল সার্কাস, ফুরিয়েছে বেলা
সঙেরা গুছিয়ে ওঠে সাজ। সব চুপ হয়ে আসে, শুধু হুইসেল বেজে যায়। স্টেশন থেকে কিছু দূরে লাল পতাকা
সোডিয়াম আলোরও যেন একটু কেমন তন্দ্রা পায়। নগরী ক্লান্ত হলে থেমে থেমে আসে অট্টালিকার স্বাদ, আর
তিন হাত জমিন হয়ে ওঠে নাগরের বুক, এক তীব্র আকাঙ্ক্ষার শুভ্র কাঁথায় মুড়িয়ে দিয়ে কারো চোখের দ্যুতি,
উপহারের ঘড়ি, বাহুর ঘ্রাণ— পিছুটান। দেখেছি সরজমিনে এ এক বিসর্জন অদ্ভুত প্রতিটি প্রিয়তমার।























