আবু তাহের সরফরাজের প্রেমের দশটি কবিতা

প্রকাশিত : জুন ১১, ২০১৯

এত প্রাঞ্জল কেন ভালোবাসা

আমাকে তুই ডেকেছিস কেন?     কিছু কি বলবি, যেন আর তেন?
এই যে যেমন, পাখিটার ঠোঁটে     কী ভাষায় তার যন্ত্রণা ফোটে।
কী কথা বাতাসে ছড়াতেছে প্রাণ    তুমি কি পাচ্ছ কথাদের ঘ্রাণ?
কথার পাহাড়ে জাদুকর থাকে       তার সাগরেদ পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে
ডানা ঝাপটায়, এইসব ছবি          লিখতেছি রে, খুবই আজগুবি
ছবির ধরণ, দুপুরের রোদ            হেঁটে হেঁটে এলো। এরকম বোধ
বলবি তো? নাকি দৃশ্যের গাঁয়ে      ঘরবাড়ি বেঁধে আর তরুছায়ে  
বাস করে যাবি, বল তো নীলিমা     বিকেলের রোদ কেন শ্যামলিমা?
আমাকে তুই ডেকেছিস কেন?      কিছু কি বলবি? সঙ্কেত যেন
তোকে ঘিরে থাকা দেহের ভাষা      এত প্রাঞ্জল কেন ভালোবাসা?

ভুলতে যদি না পারো

ভুলতে যদি না পারো তো ভুলতে হবে না
শাড়ির নিচে ভাঁজ দেয়া ব্রা খুলতে হবে না।
খুলতে পারো বুকের ভেতর লুকনো সিন্দুক
ভয় কী আছে, ইচ্ছেমতো বলুক যা নিন্দুক।

বুকের নিচে তিল যে ছিল অন্ধকারেও জ্বলত
মধ্যরাতে দুই শরীরই গোপন কথা বলত।
সে সব কথা তুলতে পারো শরীর থেকে আজ
ভুলতে যদি না পারো তো এটাই তোমার কাজ।

মৌরি ফুলের গন্ধ ছিল শাড়ির ভাঁজে তার
সেই ভাঁজে আজ থাকুক শাড়ি, লাভ কী খুঁজে আর!
সৌরভে তার স্মৃতি থাকুক, গৌরবে সংসার
শরীর আছে শরীর নিয়ে, গন্ধে কী দরকার!

পায়ের পাতায় চুমু খেয়েছিলাম

আমি জিগেশ করলাম, কেমন আছ?
কথা না বলে কী অনায়াসে
হেঁটে চলে গেলে তুমি
                যেখানে তোমার ঘর
                খুলে রাখা আছে দরজা

কী অহংকারী তোমার পা দুটো
ভুলেই গেল, একদিন
ওই পায়ের পাতায় চুমু খেয়েছিলাম।

নিজেকেই আমি ভালোবাসি

চলে যেও
একবার তবু এসো।

যতক্ষণ তুমি থাকবে
ততক্ষণ আমি বেঁচে থাকব।

তারমানে, বেঁচে থাকার জন্যে আমি তোমাকে ব্যবহার করছি
তুমি আমার অবলম্বন।

শেষপর্যন্ত নিজেকেই আমি ভালোবাসি।

নিজেকে ভালোবাসি বলেই তোমাকে পেতে চাই
কেননা, তুমিই আমার শেষ সৌন্দর্য
                       শেষ অবলম্বন

যে সৌন্দর্য না থাকলে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না।


মানুষ বেঁচে থাকে

গোলগাল চাঁদ সাঁকোটা দুলছে তিরতির কাঁপে দেহ
দুই পারে দুই মানুষের ছায়া, দুলতেছে সন্দেহ।
ভেঙে যায় ছায়া দেহ খুলে তাই বেরিয়ে এসো হে প্রাণ
ধরো, চিৎকারে আর চিৎ করে নিতেছো চাঁদের ঘ্রাণ।

চাঁদের গর্ভে ফুটে থাকা ফুলবাগানের কাছাকাছি
আমাদের দেহ আর হৃদয়ের উত্তাপে বেঁচে আছি।
বেঁচে তো রয়েছি শ্বাস নেব বলে শাসিত দেহের বাইরে
গর্ভকেশর ছড়াতেছে রেণু প্রাণের ওপর তাইরে।

বেঁচে থাকা মানে স্মৃতি-বিস্মৃতি এক জীবনের ঘোর
পেরিয়ে এসেছি মৃত্যুর মতো দেহ গহ্বর তোর।
দেহের ভেতরে রাজহাঁস ডাকে উটের মতো গ্রীবা
বাড়িয়ে সে ডাকে, ‘গোধূলির নদী পেরিয়ে এসো হে রিপা।’

মুগ্ধতা নয়, আরও প্রগাঢ় প্রেমিকের অনুভূতি
ভেঙে পড়ে চাঁদ, থত্থর কাঁপে সাঁকোটার বাঁশখুঁটি।
দুই তীরে দুই দেহ নিয়ে কেন দাঁড়িয়েই আছি আমরা?
আমাদের খুব ভেতরে কাঁপুনি টানটান তবু চামড়া।
 
গোলগাল চাঁদ সাঁকোটা দুলছে, পেরোবে কীনা তা বলো
দুই হৃদয়ের মাঝে শূন্যতা ভরাট করি হে চলো।
কী কী সব যেন মায়া রহিয়াছে এই ভবদহে হায়
আমি তো আউট সাইডার হয়ে সাইডেই থেকে যাই।

অথচ আপাত দৃশ্যে মানুষ বেঁচে তো থাকেই ভবে
দেহ আর ছায়া একাকার হোক, কবে যেন তা হবে?

আমার মৃত্যু

রাত্রি তোমার নিকষ কালো অন্ধকারের থাবা
ভয় করি না, আমার বুকে সুরক্ষিত কাবা।

ইটের ওপর ইট সাজানো ইট মানে ঈমান
বিশ্বাসে তার দৃঢ়তা আর চরিত্রে ধীমান।

সমাজ এবং মানুষ নিয়ে আবার সামাজিক
এক মানুষের ভাঙাগড়া, এই তো নানাদিক।

রাত্রি আমি নতজানু বিনয় এবং ধ্যানে
হঠাৎ হঠাৎ ভাঙে সে ধ্যান, হঠাৎ পাওয়া জ্ঞানে।

জ্ঞান তো আছে নানারকম, বিভিন্ন তার মানে
সকল জ্ঞানের দাড়িপাল্লা সব মানুষই জানে।

রাত্রি আমার বুক পকেটে ভোরের সুর্যোদয়
দূর নীলিমার বুকেই যেন আমার মৃত্যু হয়।

মাল

ভালোবাসা দিবসে জনৈক কাক
আমার বাড়ির ছাদে বসে দিল ডাক
তার হাঁকডাকে দুপুর আরো নির্জন হলো
বহুতল ভবনের ছাদে নিঃসঙ্গ বোধ করল মোবাইল টাওয়ার
কাহাতক আর ধারণ করা যায় যুগলের ফিসফাস
যেন তারও প্রেমিকা লাগে এই ভবে, দুপুরে নির্জনতা
যখন ধেয়ে যায় চারদিকে আর ডেকে যায় কাক
তার হাঁকডাকে আমারও ঘোরতর একা একা লাগে
যেন ছায়া ছাড়া আমার আর কোনও দেহ নাই
আউলা লাগে, ছুড়ে মারি ইটের টুকরা
তাড়া খায়া উড়ে যায় কাক আর তার ঠোঁট থিকা
আমারই সামনে খসে পড়ে এক ব্যবহৃত কনডম
দেখি, রাবারের ভেতর টলটল করতেছে মাল!

কুয়াশার নিচে

কুয়াশার নিচে ডুবে গেছে এই
পৃথিবীর বন্দর
হাঁটতেছি একা, খুলে রাখো হে
কুয়াশার অন্দর।

কুয়াশার ঘরে ঘুমিয়ে আছে সে
চোখ খোলা, তবু
শীতরাত শেষে ঝলমলে আলো
সূর্য ওঠান প্রভু।

জাদুকর যেন, ঘুম ভেঙে দ্যাখে,
নিঃসীম শূন্যতা
ঘিরে আছে তার দেহকোষ আর
শেকড়ের পূর্ণতা।

আদি আর শেষ মূলত সে এক
মাঝখানে যা, ফাঁকা
ক্রোমোজম কোষে নানা সংকেতে
সবই তা রয়েছে আঁকা।

ফাঁকা সময়ের হেঁয়ালি ধোঁকায়
পঞ্চভূতের দেহ
পাঁচভূতে খায়, বাকি না দেনায়?
মন করে সন্দেহ।

মনকে আজি কহ যে,
ভালোমন্দ যাহাই আসুক
             সত্য রে লও সহজে।

আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে

আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে
আমার বাড়ির ছাদে কী বসে?

ভেজামেঘ ওরে আর ডাকে গুরু গুরু
আষাঢ় মাসের তবে আজ হলো শুরু।
দুটো ব্যাঙ চুপচাপ
পুকুরে দেয় ঝাঁপ
আর দেখি, সারাদিন বৃষ্টিতে শাদা
আমিও চুপচাপ
চা খাই তিনকাপ
আর দেখি, ভিজে গেছে কবিতার খাতা।

ভেজা ভেজা হরফে
বৃষ্টির তরফে
লিখি তাই, আষাঢ়ের দিবসে
আমার বাড়ির ছাদে কী বসে?

প্রেমের ভ্রুণ 

এই প্রেম পাথরের ভেতর থেকে এসেছে। জগতের রোদ-হাওয়ার বাইরে পাথরের খুব ভেতরে ছিল প্রেমের ভ্রুণ। এরপর কত কত কোষ বিভাজন হয়ে, কীভাবে কীভাবে যেন সে প্রাণ পেল। এরপর লতার মতো পেঁচিয়ে উঠে এলো আমাদের শরীরে। বিভাজনের প্রতিটি বাঁকে যে যে স্মৃতি, এই প্রেম তা ছড়িয়ে দিল আমাদের ভেতর। আমরা তাই দুজন দুজনকে মুগ্ধতার কথা বলাবলি করলাম। এবার এসো, পরস্পরকে আমরা খুন করি। আর দেখি, আমাদের রক্ত থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে... এরপর রক্তের কোষে সঞ্চিত স্মৃতি ওম শান্তি হয়ে যাচ্ছে...