কাউসার মাহমুদের ৫ কবিতা
প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৯
দুঃখটি ১
এই ধূলিমলিন বিস্তৃত জীবনের কণ্ঠনালী ধরে প্রবল শোক-তাপ ঝরে পড়ে। কুঞ্চিত ভ্রুর কিনারে ফুটে থাকে অশ্রুত রক্তের ফুল। যেন-বা কোনোদিন মানুষের মুখোমুখি হবো না আর। পরিচিতদের কাছাকাছি যাব না। শুধু এই গুমোট স্তব্ধ জীবনের রুয়ে দেয়া দুঃখের কাছে মাথা নত হবো।
হলুদ সূর্যের নামে যে ক‘টা দিন ফুরিয়ে যায় আমার; হারিয়ে যাওয়া শঙ্খধ্বনির মতো— তা কেবল যায়-ই। মনে হয় কোনো অন্তিম সন্ধ্যার কোলে ঢলে পড়তাম যদি! হয়তোবা ছুঁয়ে দেয়া যেত, চুমু খাওয়া হতো নিজের ঠোঁট। এতকিছু হলো, এত দুঃখ গেল, পৃথিবীর ব্যাসার্ধ ভরা সবুজ ফুরোলো; অথচ বাকি রয়ে গেল সব।
বাকি রয়ে গেল নিজেকে ভালোবাসা। গভীর চুম্বনে নিজের চোখ মুছে দেয়া।
দুঃখটি ২
কতখানি নীরবতা হলে নীরবতা ঝরে পড়ে মানুষের পাশে।
শুনশান মরে গিয়ে শুধু সেই অ-বিস্তৃত নীরবতাই থাকে।
চাঁদের ঊরুর মতো উজ্জ্বল হাসির তলে
কে কোথায় কোন ব্যথা লুকিয়ে রাখে পৃথিবীর, কে জানে!
মনে হয় শুধু জানে মাটি, কান্না ভুলে যাওয়া স্তব্ধ করোটি।
আর জানে কিছুকিছু খাতা, কোনোদিন ভোরে মাড়িয়ে যাওয়া গাছের পাতা।
তাহলে এসবের পরে কে কবে ভালোবেসেছিল কাকে!
মানুষের মৃতদেহ মানুষেই টানে পৃথিবীতে।
ছেড়ে যাওয়া
অনুচ্চার স্তিমিত কোনো আওয়াজের তলে ঢাকা এই সুগন্ধী রাত। তার ভেতর, সুপরিচিত প্রলুব্ধ অন্ধকারই কেবল আমারে ডাকে। আমারে ডাকে জেগে থাকা। যেন-বা বিলীন কোনো অশুভ ছায়ার ভেতর ধীরে-ধীরে ঢুকে যাব।
এ এক অসীম নিঃশব্দকাল। মনে হয় পোয়াতি বাতাসের ঋজু হয়ে পড়ে থাকা। যেখানে মৃত্যুর নীরবতা চারপাশ সাজিয়ে আসে। মূক ময়ূরেরা দোলায়ে যায় আবছায়া পায়ের পাতা।
এমন এক গভীর নৈঃশব্দ্য সময়ের ভেতর; কারা যেন তবুও ডাকে। ভালোবাসাবাসি করে। আদতে মানুষ জানে, কখন তাদের ছেড়ে যেতে হবে ফেরা হবে বলে।
বৃহস্পতিবার
একটা মসৃণ দীর্ঘশ্বাসে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা বৃহস্পতিবার। কোথাও দূরে, কারো চোখের পাতাজুড়ে বিলাপিনী আহ্বান! তার পাশে, সন্ধ্যা ঘনীভূত মাগরেবের আজানে, অনতিদূর কোথাও মায়ের আবছা ছায়াটি কাঁপে। যেন অপেক্ষায় অপেক্ষায় গায়ের শাড়িটি সন্তানহারা হয়ে যাচ্ছে। অথচ কোনোদিন ফেরা হবে না জেনে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তিতির।
এমন বিষণ্ণ বৃহস্পতিবারে দিনমান শুধু বেদনাময় কোমল রাত্রিটির অপেক্ষা। যেখানে অশ্রুত পরিখার মাঝে নিঃশব্দে নিচের ঠোঁটটি কামড়ে ধরে অনতিক্রম্য কান্না রোধ। আর বিস্তৃত একাকিত্বের মাঝে, বিমর্ষ সময়ের মুখে বাবার ঘরে ফেরাকালীন জুতোর শব্দ আহরণ।
আহত কেয়াফুল
সমচতুর্ভূজ বিদ্রুপ ঝরে কেয়াফুল তলে। বিরাগিণী মূর্চ্ছিত; নিতল মধুস্বরে ডাকে অপরাজেয় পরিহাস। যেন সাদা ওড়নাটি কিংবা নীল শাড়িটির গায়ে ত্রস্ত পরিমার্জিত লোকাচার।
অথচ একদা শালিকের ঠোঁটে মৃদুভাব দেখে হেসেছিল সে। সুধীর জোছনার খলবল চোখে সেই যে নেচেছিল! বুকের উলম্ব রেখাটি ধরে ডেকেছিল বন্ধুর নাম। সেই তো! তারপর, তারপর! কেয়াফুল ঘুমিয়ে গেলে জেগে উঠেছিল চতুর সকল।























