কাজল শাহনেওয়াজের একগুচ্ছ কবিতা
প্রকাশিত : জুলাই ১৮, ২০১৯
রাজনীতিক কাউরে নিয়াই আমার কোনো কথা বলতে ইচ্ছা করে না। তাদের বড় বড় কীর্তি, মহান কর্মকাণ্ড, স্মৃতি বা সত্তা কোনো কিছুকেই ফিরে তাকিয়ে দেখি না।
তবে সদ্য প্রয়াত বিচিত্রকীর্তি স্বৈরশাসক এরশাদকে নিয়া দুএকটা কথা বলার জন্য মনটা খুব প্যাকপ্যাক করে উঠতেছে। আমাদের যৌবনটাকে তুমুল উত্তেজনায় ভরে দেবার জন্য এই লোকটা অনেক কিছু করেছে। আমাদের সেই সব দিনগুলিকে উনি ভরে তুলেছিলেন মিথ্যা আর নষ্টামি দিয়ে। বাঙালি আর্মির যে বুট আছে আর পুলিশের বন্দুক দিয়ে গুলি বের হয়, আমরা ছাত্ররা তা জেনেছিলাম। আর দেখেছিলাম ট্রাক মাথার উপর উঠে যায় কার নির্দেশে।
এরশাদ ছিল সত্যিকারের ভড়ং আর দেখানোপনায় ওস্তাদ। তরুণদের হাতে কিভাবে ড্রাগ তুলে দিতে হয়, তার প্রধান শিক্ষক ছিল এই লোকটা। অর্গানাইজড ক্রাইম শুরু করিয়ে দিয়েছিল। ডেকে এনেছিল ঘুমন্ত প্রাচীন সেই শক্তিকে, যার নাম ধর্মীয় রাজনীতি।
আমাদের অনেক বন্ধু নষ্ট রাজনীতিতে হাতেখড়ি পেয়েছিল। টেরর হয়ে উঠেছিল। তাদের হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়ে, ভিসিআরে নীল ছবি চালানোর পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে ডার্টিমানির স্বাদ দিয়েছিল। আমাদের দিনগুলি ক্রমে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। আমরা ক্লান্ত হয়ে স্বপ্ন বা প্রেম থেকে মুখ তুলে নিয়েছিলাম।
যাটের দশকে যেভাবে সামরিকতন্ত্র সাহিত্য/সংস্কৃতিতে একটা ঝাঁকুনি দিয়েছিল, ১৯৮০র দশকের সামরিকায়ন সেই রকম একটা কিছু করেছিল। আমি অনেকগুলি কবিতায় এইসব জীবনযাপন লিপিবদ্ধ করেছিলাম। প্রথম কবিতার বইটা (জলমগ্ন পাঠশালা) উল্টাতে গিয়ে খুঁজে পাই সেই সব দিনের দিনলিপি। কয়েকটা কবিতার অংশ বিশেষ নমুনা হিসাবে দেয়া গেল। —কাজল শাহনেওয়াজ
পরিস্থিতি
আসবে যদি ভাব নিতে তবে পিপা নিয়ে এসো
কালো ওয়েল্ডিং গ্লাস চোখে পরে এসো
সীসার জ্যাকেট পরে এসো
মিলিটারি বুট পায়ে এসো
গ্লাভস নিয়ে এসো
বলাতো যায় না কখন কি ঘটে যায়!
টেরর ছেলেটি যেভাবে বলেছিল
এমনি দিনে হোন্ডা এক্সএল এ
হাতের ক্ল্যাচ ভীষণ সন্ত্রস্ত
হু হু হাওয়া, নুনে পোড়া কালো চোখ
যে কোন সময় আটকাতে পারে পথ
বাঁকা ট্রিগারের ধাক্কায় ছোটা সীসার চুম্বন।
গতি গতি আরো গতি
তীর বেগে চলেছি একাকী
আর্তনাদের গীয়ারে রেখে পা
পদ্যের বই
গুমটি ঘরে লুকিয়ে ছিলাম বেশ কয়েকটি রাত
বুটের লাথির ভয়ে/শালিখ আর চড়ুই এসে ব্যঙ্গ করতো প্রতিটি সকাল
ওরা আজকাল ভয়ই পায় না/মেনে নিয়েছে ফেরারী লোকজন।
বাইরে ঝুলছে তালার গহ্বর/ব্রোঞ্জযুগের নিদর্শনের মতো
দরোজা থেকে এঁকেবেঁকে ঠিক ভেতরের দিকে/একটি গোপন তক্তপোষ।
সঙ্গে ঝোলার মধ্যে রোগা কাব্যগ্রন্থ, হলুদ মলাট/প্রথম পাতা ছেঁড়া
দেশ এখন উপচে পড়ছে আর্তনাদের ফেনায়
বদ্ধ ঘরে টিনের চালে সেই শব্দের কাঁপন লাগে।
নিশানা নেই পথের
বসে আছেন যারা বসে থাকার, হাত তুলছেন, পা তুলছেন
খুলে দেবেন ঈশ্বরের তালা?
কারা, তারা কারা?
হেরোইন
দু’হাটুতে মাথা, আত্মদর্শনের গোলার ভেতর গোলা
ধরে আছি শক্ত করে হলুদ রোদেলা
পাখির নখ দিয়ে পড়ো-পড়ো অমৃতের ডাল
সাদা দেয়াল, শাদা দেয়াল— কিছুটা বেখেয়াল
ছবির সারি, ছবি থেকে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম— যেন সবুজ ঘাস
সোজা মানুষগুলোর চোখ ভরা কালো সন্দেহ, নির্মম অবিশ্বাস
তুল্যমূল্য, তুল্যমূল্য হিসাব, কালো পিঁপড়ের সারি
ঘাস, শুধু ঘাস আজ বিকেলের আততায়ী বাড়ি
থেকে রাতের ক্ষয়ে যাওয়া নখের নেবুলা।
একটি বিকল্প কবিতা
ঊনিশ শো তিরাশি, ১৫ই এপ্রিল, ১লা বৈশাখ
আমি একটি লেঅফ ঘোষিত কারখানার সন্ধান পাই।
মেশিন পত্র জংধরা, বিষণ্ণ স্যুইচের সারি মাকড়শার অন্তিম আঁশে ডুবে রয়েছে। শ্যাওলা ছবির কাছে অদ্ভুতভাবে খুলে পড়ে আছে প্রধান গীয়ার। ধাতব লিভারগুলি বাঁকা করে শয়তানের মুখে গুঁজে দেওয়া।
১৯৮৫
তাই সরে আসি। আমার গলে যেতে ইচ্ছে করে, পচে যেতে। ছিঁড়ে, ভেঙে, চেপ্টে যেতে। শয়তানের কাছে বিক্রি হয়ে যেতে।
একদিন রাতে হাঁটতে হাঁটতে কালো নদীর পাড়ে যাই। শয়তানের শনিভোজ। জাহাজের হাড়গোড় মাড়িয়ে, চাঁদ ফাঁকি দিয়ে উপসি`ত হই অন্ধকারের মধ্যে ক্ষার-কাদায় দাঁড়িয়ে থাকতে। সামনে কালো আগুন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি যতক্ষণ না আকাশে অশুভ নির্বান্ধব তারা ওঠে। ততক্ষণে পায়ের মাংশ ক্ষারে ধুয়ে যায়। হাড়ের দুটো কাঠির উপর দাঁড়িয়ে থাকি। গাদের স্রোত বয়ে যায়... মেরুদন্ডগলা মানুষের বুদবুদ, গলগল করে বেরুনো চিমনিফাঁটা মেয়েলোক ধুঁয়া, ধাতুক্যান্সার, স্নায়ু যান্ত্রিকীকরণ। কালো ভালোবাসা, কালো দীর্ঘজীবিতা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবি কবে বসবো, বসে বসে ভাবি আর কবে দাঁড়াবো।
ছোট চিন্তা, সংক্ষিপ্ত ভাবাবেগ, নি:শব্দ প্রকাশ।
আমাকে আমৃত্যু এই ক্ষীণ বিস্তারটুকুতেই সাঁতরাতে হবে।
আমরা ক’জন শীত ও বর্ষাকালীন শাকসব্জী
আমরা ক’জন শীত ও বর্ষাকালীন শাকসব্জী, বাংলাভাষা, বামরাজনীতি,
বিজ্ঞানের জয়যাত্রা ভালোবাসি
তাই আজ বেছে নিতে হয় এলোমেলো জীবনযাপন, লম্বাচুল, অনিশ্চয়তা
হাতে তুলে নিই হেরোয়িন গুড়া, সুঁই ও সিরিঞ্জ, নাজু ওয়ার্ক্সের সিস্টেম,
পাতিরাম, বয়রার চরশ
আমরা ক’জন ইটের রাস্তার উপর পিচ দিতে ভালোবাসি তাই মরাখোলা যাই
খুঁজে বের করি দাগীলোক
সূর্যাস্তের দৃশ্য ছেড়ে বেড়ার ঘরে বসে থাকি
ছেলেটি ও মেয়েটি
ছেলেটি পরেছে তারপুলিন
শ্লোগানে বসে গেছে গলা—
ছেলেটি কি চায় আজ নিজের কাছে?
মেয়েটি যে নিস্ফলা!























