কিশোয়ার জাবিনের ৩ কবিতা
প্রকাশিত : নভেম্বর ১৯, ২০১৮
বিবর্ণ প্রজাপতি
একসময় আমি খুব চঞ্চল ছিলাম। আমার দুটো অনেক দৃঢ় এবং খুবই রঙিন ডানা ছিল। সেই ডানায় ভর করে আমি উড়ে বেড়াতাম দিগন্ত থেকে দিগন্তে। চলে যেতাম মেঘের উপরে স্বপ্ন রাজ্যের কাছাকাছি। এভারেস্ট থেকে আল্পসের চূড়ায় ছিল আমার অবাধ বিচরণ। ফুল থেকে ফুলে ঘুড়ে বেড়ানো আমার পোষাতো না। ডানা মেললেই পৌঁছে যেতাম শনির বলয়ের কাছাকাছি। পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি পারত না আমাকে ধরে রাখতে।
আমার পাখা দুটো ছিল খুবি বর্ণিল। যখন আমি পাখা মেলতাম, সমস্ত প্রকৃতি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত ডানার সৌন্দর্যের দিকে। নানা রঙের নকশাকাটা পাখা দুটোর অপরূপ রূপে বাকরুদ্ধ হয়ে যেত চরাচর। আর আমি? আমি ছিলাম নিজের আনন্দেই বিভোর। তারপর একদিন উঠল ভয়ংকর ঝড়। বিধ্বংসী সেই ঝড়ে পৃথিবী হলো লণ্ডভণ্ড। সমস্ত চরাচরে বয়ে গেল প্রলয়। কিন্তু সেই প্রলয় স্পর্শ করতে পারেনি আমাকে। কারণ আমার সুদৃঢ় দুই ডানা দিয়ে নিজেকে আড়াল করে পৃথিবীর প্রাচীণতম কোটরে আমি লুকিয়ে ছিলাম।
ঝড় থামার পর, পাখা মেলে যখন উড়লাম, আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আমার দু’চোখ ভরে গেল জলে। প্রলয়ে মুছে গেছে আকাশের নীল রঙ। গাছেরা সব সবুজ হারিয়ে নিস্তেজ। সমস্ত ফুলের রঙ গেছে মুছে। আর পৃথিবীর সুন্দরতম সমুদ্র তার সমস্ত চঞ্চলতা হারিয়ে স্থির। পৃথিবী রঙ রূপ হারিয়ে এমন বিবর্ণ হয়ে গেলে কিভাবে হবে? বিবর্ণ পৃথিবীর ক্যানভাসে রঙিন আমার পাখা বড্ড বেশি বেমানান লাগবে না?
আমি বুঝতে পারছিলাম না আমি কী করব! তাই পালানর জন্য মেলে দিলাম আমার সুদৃঢ় রঙিন ডানা। আকাশের কাছাকাছি পৌঁছাতেই, আকাশ তার বিবর্ণ মেঘলা দৃষ্টি মেলে আমার কাছে নীল রঙ ধার চাইল। আমার ডানা হারাল তার প্রিয়তম নীল রঙ। সবুজহীন গাছগুলো এতই বিসদৃশ লাগছিল যে, দিয়ে দিলাম আমার সবুজ রংটুকু। সব ফুলের মাঝে বিলিয়ে দিলাম আমার রংধনু রঙের নকশার সব রঙ। আমার পাখা হলো বিবর্ণ।
বিবর্ণ পাখা নিয়ে উড়ে গেলাম প্রলয়ে বিধ্বস্ত হিমালয়ের কাছে একটু আশ্রয়ের জন্য। কী আশ্চর্য! প্রলয়ে আমার হিমালয় হারিয়েছে তার ঋজুতা। হিমালয়কে দিলাম আমার সবচেয়ে বড় সম্বল, আমার ডানার দৃঢ়তা। আমি শক্তিহীন হলাম। শক্তিহীন বিবর্ণ প্রজাপতির কী চঞ্চলতা মানায়? তাই সমস্ত চঞ্চলতাটুকু দিয়ে দিলাম সমুদ্রকে। বললাম, হে জলধি, তুমি উচ্ছ্বল হও।
আরা আমি? পৃথিবীর সুন্দরতম প্রজাপতি, আমি স্থির হলাম। সকল রঙ, সকল চঞ্চলতা, সকল দৃঢ়তা হারিয়ে আমি পড়ে রইলাম পৃথিবীর প্রাচীণতম গুহায়। আমি সংসারী হলাম...
ভেলপুরি বনাম তুমি
কোনটা বেশি ভালোবাসি?
তোমার চোখের মুগ্ধতা
নাকি আমার ডানার স্বাধীনতা?
ভেলপুরি মুখে দিয়ে
আলগা ন্যাকামি চোখে এঁকে
যখন তোমার দিকে তাকাই,
দেখি, তুমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছো আমার কণ্ঠার ওঠানামা।
আমি কিন্তু তখন তলিয়ে গেছি ভেলপুরির প্রাচীনতম স্বাদে।
মাখানো আমড়ার ঝাঁঝালো স্বাদে যখন আমার চোখ বুজে আসে
তুমি ভাবো, তোমার চোখের মুগ্ধ দৃষ্টিতে লজ্জা পেয়ে
আমি চোখ বন্ধ করেছি।
কী সরল তুমি!
আর কী জটিল আমার সমীকরণ!
আসলে কি জানো?
আমার আত্মপ্রেম বড় বেশি তীব্র।
তাই, মনের মাঝে জনম নেয় না
অন্যের প্রতি কোনো প্রেমবোধ।
তুমি বোঝো না এই জটিল ভালোবাসা।
আর তাই তো, ভোলাতে চাও আমাকে...
উপহারে, স্তুতিতে, নীলরঙা পদ্মফুলে।
তোমাদের কারো কোনো কিছুই আমাকে মুগ্ধ করে না।
তোমাদের অর্ঘ্য, তোমাদের পুজা, তোমাদের বলিদান...
কিছুই স্পর্শ করে না আমাকে।
আমার সকল মুগ্ধতা শুধুই আমাকে ঘিরে।
নার্সিসাসের মতো আত্মপ্রেমের অভিশাপ
আমি একাই উপভোগ করি।
শূন্যের সংসার
হাত না ধরেও হাঁটা যায় হাত ধরে।
ছায়া না হয়েও মিশে যাওয়া যায় ছায়ায়।
আজীবন বয়ে যাওয়া যায় রেললাইনের মতো
সমান্তরাল জীবন।
আজীবন করে যাওয়া যায় শূন্যের সংসার...
শুধু তোমারই সাথে
শুধু তোমাকেই ভালোবেসে।
সেই সংসারে
আমি হবো তোমার রোদচশমা,
আমি হবো তোমার চায়ের পেয়ালা,
আমি হবো তোমার সৌখিন হাতঘড়ি।
আর তুমি?
তুমি হবে আমার শেষ গন্তব্য
দিগন্তের কাছে যার বসবাস।
যতই চেষ্টা করি,
পারবো না তোমাকে ছুঁতে।
তুমি হবে আমার শেষ দীর্ঘশ্বাস।























