জাকির তালুকদারের ৫ কবিতা
প্রকাশিত : অক্টোবর ০৮, ২০১৯
জাকির তালুকদার মূলত কথাসাহিত্যিক। বাংলা কথাসাহিত্যে এরই মধ্যে তিনি প্রতিষ্ঠিত আসন তৈরি করে নিয়েছেন। তার মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘পিতৃগণ’ সমকালীন কথাসাহিত্যে একটি মৌলিক সংযোজন। তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক এবং স্বাস্থ্যঅর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর। লেখালেখির শুরু থেকেই জাকির নিজস্ব একটি ধারা নির্মাণে সচেষ্ট ছিলেন। তার লেখায় ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরাণের সংমিশ্রণ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মাত্রা নিয়ে উপস্থিত হয়।
পিতৃগণ ছাড়াও কুরসিনামা, মুসলমানমঙ্গল, কবি ও কামিনী, ছায়াবাস্তব, কল্পনা চাকমা ও রাজার সেপাই তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। ‘মুসলমানমঙ্গল’ বইয়ের জন্যে তিনি ২০১৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়া তার ঝুলিতে রয়েছে জেমকন কথাসাহিত্য পুরস্কার। অনেক পাঠকই জানেন না যে, কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার চমৎকার কবিতাও লেখেন। যদিও কথাসাহিত্যের আড়ালে পড়ে তার কবিতাগুলোর আত্মপ্রকাশ সেভাবে ঘটেনি। ছাড়পত্রের পাঠকদের জন্যে জাকির তালুকদারের পাঁচটি তরতাজা কবিতা উপহার দেয়া হলো:
আরেকটা শরীর
মেরুদণ্ড পলিথিন ব্যাগে ভরা।
আরেকটা শরীর দাও প্রভু
একটু স্পর্ধাভরে হাঁটি।
শব্দের স্বয়ম্বরা সভায়
অশরীরী প্রেতনৃত্য—
আমার তো ছায়াই সম্বল।
উর্বরা নারীদের ভিড়ে
নপুংশকের মতো কুণ্ঠিত বিস্ময়।
আরেকটা শরীর দাও প্রভু
ছুঁয়ে-ছেনে দেখে আসি শব্দের ক্রোধ।
জন্মযান
জন্মযানে উঠলে কেউ আর মধ্যবিত্ত থাকে না,
লাশকাটা ঘরে দাঁড়িয়ে কর্পুর বিলায় ডাকপিয়ন,
সুগন্ধি বিপণি খুলে বসে তিনজন হস্তি
তারা বলে, আমরাই তো মৃগনাভি চাষ করি—
শুঁড়ের শৃঙ্গারে হরিণীর শীৎকারই তো কস্তুরি।
জন্মযানে উঠলে দরকার হয় সূঁচসুতো
কেননা আমরা তখন জোনাকি গেঁথে
জামার বোতাম বানাই। আর জোনাকিরা
চাঁদের সাথে খেলতে থাকে সাপলুডো।
আমাদের চটিগুলো হয়ে যায় আনন্দশংকর
তারাও জীবত্বে আসে, আর কাঁধের ঝোলাগুলো
হয়ে যায় দ্যুতিমান বাতাসের বাসগৃহ।
জন্মযানে উঠলেই সংসারবন্দিনী বুঝে ফেলে— আহ্
কয়েকটা মাত্র শিহরণ জীবনে, বাদবাকি পাথর জীবন!
বিষাদচক্র
এ বিষাদ তোমাকেও ছোঁবে।
হরপ্পায় আর্যের মাতাল জয়চিহ্ন
মানুষের ইতিহাসে কড়া নাড়ে, শুধু
তরতাজা রয়ে গেছে মহেঞ্জোদারোর দীর্ঘশ্বাস।
হরপ্পায় সৌধ ছিল, প্রশস্ত উদ্যান
জ্যামিতিক সড়কের জ্ঞান
প্রেম ছিল, সভ্যতার প্রবাহক প্রেম।
প্রেমিকার শুদ্ধনামে পুরুষেরা ডেকেছে নদীকে
হুতাশনে নদীও শুয়েছে তাই অভিন্ন চিতায়।
চিতা নেই, তার গায়ে সময়ের ধুলি
নদী নেই, আছে তবু নদীর বিষাদ।
নদী যদি শুদ্ধ হয়, এ বিষাদ তোমাকেও ছোঁবে।
মধ্যমায় পরে আছি অসুস্থ অঙ্গুরি
চকমকি পাথর সে, আত্মায় ছড়িয়ে দেয় পবিত্র উষ্ণতা
রোগশয্যা হয়ে ওঠে তীর্থস্থান, অবিশ্রাম স্তোত্রপাঠ চলে।
ত্রিকাল মন্থনকারী ঋষি আর মহাপুরুষের শ্মশ্রু বেয়ে
ঝরে পড়ে জ্যোৎস্নার মতো আশীর্বাণী— ওম শান্তি! ওম শান্তি!
মহাকাল টুকরো টুকরো হয়ে খসে পড়ে আত্মার দু’পাশে
যেন নার্সের পেলব হাতে কমলার খুলে রাখা রসকোয়া।
যীশুর স্নেহ চোখে বরাভয়— অসুখ আত্মার পুণ্যস্নান
দিনযাপনের জরাজীর্ণ গ্লানি ধুয়ে উঠে এসো রাজহাঁস।
সুমিত নাব্য আমি পাইনি কখনো খুঁজে রমণীশরীরে
মুগ্ধতা আসেনি তাই ভালোবাসা রয়ে গেছে অভিমানে দূরে।
অজানা সংকেতে যক্ষ খুলে দেয় প্রত্যাশার লুকানো দরোজা—
সাদা স্ক্রীন সরিয়ে এই বুঝি উঁকি দেবে রঙধনু হৃদয়!
কতদূর এগুলো মানুষ, পথে পথে রেখে গেল কতটা ক্রূরতা?
পুরাতন খোলসের মতো কতবার বদলেছে দেহ-মুখ?
অসুখ আয়না ধরে, আমার দু’চোখ পায় স্ফটিক-স্বচ্ছতা
মানুষের ইতিহাস আত্মায় পূর্ণাঙ্গ গেঁথে জাতিস্মর হই।
জীবনের পাত্র-উপচানো ফেনা সরে গেছে যেন সূর্যস্পর্শ।
অর্ধেক পূর্ণতা নাকি অর্ধেক শূন্যতা? আরোহ ও অবরোহ
দুইজনে ভিন্ন কথা বলে, তুলে ধরে দুর্বোধ্য উপাত্ত সূত্র।
অসুখ উত্তর জানে— মধ্যমায় পরে আছি অসুস্থ অঙ্গুরি।
উত্তরাধিকার
অধীর হোসনে বাপ
এই ঘর-গেরস্থালি তোর হাতে দেব।
তোর হাতে দিয়ে যাব অনাহারী দিনগুলো
অভাব-আগুনে পোড়া গৃহিণী গিতান।
দিয়ে যাব মেঠোপথ নিসর্গের ছায়া
পউষে কুলায় ভরা নবান্নের ধান।
না-সবুর হোসনে রে বাপ!
তীতুমীরের বাঁশের কেল্লা, সূর্যসেন, প্রীতিলতা
বরকত-রফিক-সালাম-একুশের শহিদ মিনার
তোর নামে লিখে দেব সব।
আর দেব বাংলাদেশ-আজন্ম দুখিনী এক মৃন্ময়ী
নখরের দাগ যার দেহে আঁকা হাজার পশুর
তাতার-তৈমুর থেকে বেনিয়া ব্রিটিশ।
ধানের শীষের রঙে কপোল রাঙিয়ে
ডুরে তাঁত শাড়ি দিস তার গায়ে তুলে।
অভাব ছোবল মারে মনসা দেবির মতো
বেহুলার বাসর এদেশে।
উপেক্ষার ধুলো ছুঁড়ে মনসার আক্রোশি দু’চোখে
বল্ বাপ— মনসাকে মানি না, চাঁদ সদাগর আমি!
তোকে আমি দিয়ে যাব রক্তলাল স্বাধীনতার লাবণ্য
এই শঙ্খনীল সংসার।























