পাপিয়া জেরীনের ৬ কবিতা

প্রকাশিত : জানুয়ারি ৩০, ২০১৯

দ্বৈপ

করমচা ধরে আছে একবিন্দু স্বেদ
বিহ্বল রোদে ফেটে গ্যাছে অলৌকিক তরমুজ
ডুমুরের বুকে জমে আছে চিনিচোর কালো পিঁপড়ার দল
পুকুরে ডুবুডুবু তাল

পড়ে আছি চৌচির এইখানে
দ্বিধার মতন
একটা ভাঙাচোরা ক্যারাভ্যান
দূরে হরিণীর সংশয়
আরো দূরে রক্তের ঘ্রাণ
শাবকের বিচ্ছিন্ন শরীর
কাঁপা কাঁপা

এইখানে পড়ে থাকি
মৃত নই, মৃতের মতন
করমচা ধরে আছে একবিন্দু স্বেদ
মাচা বেঁকে ঝুলে আছে সূতানরী লতা
সবুজাভ লাউ
ফেনিল ফুলের ভিড়ে

ভেতরে রুদ্ধ  আকাশ হেলে আছে
পাখিদের ডানার ভার
বাতাসে
ফিকে রং প্রজাপতি
বিহ্বল রোদে করমচা ধরে আছে একবিন্দু  স্বেদ

পড়ে আছি এইখানে  চৌচির দ্বিধার মতন...

অন্তর্দ্বন্দ্ব

বসন্ত বাউড়ি নেমে গ্যাছে
উড়ে যাচ্ছে পোকার সংসার

বউঠাপানো বিকেলে
নড়ে  উঠছে লোহার খুঁটি
ঢেঁকিঘরে খুলে যাচ্ছে শস্যের হলুদ পিরান

হুঁকোমুখো মানুষ আর মানুষের মুখ আহারের খোঁজে
সবুজ কবর হয়ে ধানক্ষেতে—

সুঁইচোরা নেমে গ্যাছে
উড়ে যাচ্ছে পোকার সংসার

বউঠাপানো বিকেলে
বসন্ত বাউড়ি নেমে গ্যাছে
ঢেঁকিঘরে ঘেমে আছে পিতলের নাক

শ্বাসের দীর্ঘবিলাপে খুলে যাচ্ছে শস্যের হলুদ পিরান, সোনার নরুন;
প্রাচীন শিকল বাঁধা তার পায়ের গিঁটে গিঁটে…

শীতে

একটা লাল কম্বলের পাশ ঘেঁষে রোদ নেমে গ্যাছে
আমরা শুয়ে আছি
চায়ের কাপে গাঢ়তর লাল

আর আমাদের রং ফিকে
আমরা শুয়ে আছি, অনিচ্ছুক

ল্যাবিয়া শুষ্ক ভঙ্গুর
মৃত পাতার মতো কুঁকড়ে আছে টেস্টিস

ফ্যাকাশে স্তনে দেবে আছে হাত আনমনে
রোদ গলে নামছে
আমরা খুব কাছে—
একজোড়া নিষ্প্রাণ স্লিপারের মতো

কাপে গাঢ়তর লাল
ধোঁয়ারা উড়ে যাচ্ছে— ফ্লেভারড লেফ্ট-সোউল

ক্লেদাক্ত পায়ের কাছে  
উড়ে বসা মাছি—
আমরা অনিচ্ছুক, তারা বিভোর সঙ্গমে

আমাদের মন নেই আজ
শরীর খুব কাছাকাছি নিভে আছে শীতে।

ইতি ভ্যালেন্তিনা

প্রত্যেকটা তিল চুমুপ্রার্থী—
তোমার প্রত্যেকটা রোমকূপ, পায়ের আঙুল,
চপ্পলের তলা আমার চুমুর জন্য হা হয়ে আছে;

এই অদ্ভুত টিনের সবুজ চালে অবিরাম বৃষ্টির দাগ—
তোমার শরীর বেয়ে নেমে গেছে বলিভিয়ার বদ্ধ ড্রেনে;
সেইসব দাগ, কপালের জ্বরতপ্ত তিল চুমুর জন্য কেমন উদগ্রীব হয়ে আছে, দ্যাখো!

তোমার প্রত্যেকটা তিল চুমুপ্রার্থী
শ্লোগানে বেঁকে ওঠা আলজিভ, মাম্বার মতো ফুঁসে ওঠা চুল, নিরস্ত্র দুটি হাত—
চুমুর জন্য কেমন উদ্বেল হয়ে আছে!

আার্নেস্তো, আজ আমার একটি চুমুও মিথ্যে ছিল না,
মনে হচ্ছিল ভ্যালেগ্রান্দের গণকবরে তুমি উপুড় হয়ে আছ—
আর চুমোয় চুমোয় আমি টেনে তুলছি নয় নয়টি নরম বুলেট!

এইসব দৃশ্যরা তোমার

ইটভাঙা শ্রমিকের হাতুড়ি দেখা যায়—
অতর্কিতে বেরিয়ে আসে পাথরের গোপন ফাটল,
কামিজে ঝনঝন করে পুরোনো মোহরের মতো দুধ;

টং দোকান থেকে দুজন বুড়ো আদম
শাবল গেঁড়ে দেখে প্রত্নঘটী
যদিওবা বেঞ্চিতে ঠেকে আছে ফলদ প্রোস্টেট,

ফুঁসে ওঠা কেতলির ভেতর নেতিয়ে পড়ছে চা
একটা দুইটা হলিউড পুড়ছে
মেয়েরা হেঁটে যাচ্ছে গার্মেন্টস—
হাতে টিফিন ক্যারিয়ার
চুল চুয়ে নেমে গেল রাতের গলদঘর্ম।

পথের পাশে এইসব দৃশ্যরা তোমার
অথচ, তুমি একটা ক্লোজশট হয়ে ফ্রেমে—
মেডিকেলে পড়ে আছ
চোখ স্থির, নুয়ে আছে ঝড়ে ভাঙা ডানা!

ফোনসেক্স ৩

অদ্ভুত তোমার উষ্মশ্বাস—
প্রাচীন মকবরা ঠেলে
উঠে আসা পাকুড়ের বন

তোমার কণ্ঠস্বর
আমার পাঁচিল চড়ে বসেছে
ভেঙে পড়ছে মখদুম মঞ্জিল

ছুড়ে দিচ্ছ শব্দবন্ধ শরীর
সুম্বন-চুম্বন, মকমকি...

পৌর্বাহিক সঙ্গমের স্মৃতি
পড়ে আছে পায়ের কাছে

অদ্ভুত  তোমার পা জোড়া—
ক্রমশ আবলুশ অন্ধকার
ঢেকে দিচ্ছে বিজোড় জৈতুন

তুমি উষ্মশ্বাস, শব্দবন্ধ শরীর—
প্রাচীন মকবরা ঠেলে
উঠে আসা পাকুড়ের বন;

আমি আপ্তকাম
তুমি আপ্তকাম
একটা মার্জারি-জিভ চেটে দিচ্ছে
আমাদের নিরায়ুধ মন।