ফরিদ সুমনের ৫ কবিতা
প্রকাশিত : আগস্ট ১২, ২০১৯
পৃথিবী আবার শান্ত হবে
কোনোদিন, কোনো একদিন
এইসব মৃত ঘাস, এই মরা নদী
এই চলে যাওয়া পাখির কুজন
ক্ষয়ে যাওয়া পাহাড়ের হাহাকার
কোনোদিন যদি বলে ওঠে, এই নাও
তোমাদের লোভের সাগর, পান করো নোনা জল
দুর্ভিক্ষের বিপরীতে হাতে তুলে নাও
এইসব বিষময় ফল
বুঝে নাও
তোমাদের অবহেলায় বেজে ওঠা
ধরিত্রীর গভীর হাহাকার
মাথা পেতে নাও তোমাদের যাবতীয় দুর্নাম
ওহে আশরাফুল মাখলুকাত
এইতো এটাই
তোমাদের নিজ হাতে গড়া জাহান্নাম!
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক
একদিন সব ধুয়েমুছে যাবে
একদিন
মানুষ তাদের সমস্ত পাপ
ঝেড়েমুছে ফেলে
পরওয়ারদিগারের সামনে দাঁড়িয়ে বলবে,
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক
পৃথিবীর জোয়ার-ভাটা, অমাবস্যা-পূর্ণিমা
রাত ও দিন
সমস্ত কিছুর অধিপতি তুমি
তোমার সামনে দাঁড়ালাম
একটা ক্ষুদ্র পিঁপড়া থেকে
অতিকায় হাতি, সবই তোমার সৃষ্টি
আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স থেকে
নক্ষত্ররাজির মধ্যে পরিভ্রমণ
মায়া, মেসোপটেমিয়া, ব্যাবিলন থেকে
হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো, তোমার ইশারা ছাড়া
ফোটেনি একটিও গোলাপ পৃথিবীতে
কোনোকিছুই তোমার ইচ্ছার বহির্ভূত নয়
ইয়া রব, আমাকে নাও, তোমার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের
এই অতিক্ষুদ্র কণা-অনুকণা
এই আমি, আমাকে নাও
‘লা শারিকা লাকা লাব্বাইক’
আমাকে নাও।
আমাদেরও প্রেম ছিল
আমাদের হৃদয় বেশি কিছু নয়
গাঢ় বিষাদের পরে
কোনো মহুয়ার রাতে ঢলে পড়া যুবতীর
কণ্ঠহারের মোতিটির মতন
চুপিসারে, গেয়ে ওঠা, নীল, নগ্ন, প্ররোচিত
এক আষাঢ়ের রাত, ভিজে ভিজে
ভেজা হলো না যাদের
আঙুলে আঙুল রেখেও
যাদের হলো না ছোঁয়া
আমাদের এই দুটি
বর্ষাক্রান্ত একাকী হৃদয়
আহা! আমাদের
পরষ্পরের দূরবাসী হৃদয়!
হাজার রাতের গল্প
কাল সারারাত
তোমার নাম ধরে ডেকে ডেকে
ঘুমডোবা পাখিদের বনে উড়িয়ে দিয়েছি
কুয়াশার চিঠি।
শুকনো পাতার বুকে জমিয়েছি শিশিরের ঘ্রাণ
চুপচাপ, টুপটাপ।
কাল সারারাত
উপড়ে ফেলা শেকড় নিংড়ে তুমি
অবিরাম ঝরিয়েছো অঘ্রাণের বিষ এবং
আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বিষণ্ণ নদীর মতো
এঁকেবেঁকে বয়ে গেছো দূরে।
কাল সারারাত
তোমার অবহেলাকে স্যালুট ঠুকে
অভিমানের দিগন্ত অতিক্রম করে গেছে
পুরো একটি সেনাবাহিনী।
কাল সারারাত
ঘুমন্ত শহর থেকে দূরে রংরাং পাহাড়ের গায়ে
সমস্ত ঘাস ভিজে গেছে শীতল হাহাকারে।
কাল সারারাত কিছুই হয়নি জানো?
হৃদয় শুধু ডুবে ছিল নিকষ অন্ধকারে।
সহস্র রজনীর খুনোখুনি
চলে যাব বলে মনস্থির করলাম, দেখি এক প্রৌঢ় যুগল
বাদামের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে হাসছে আর পরস্পরের গায়ে ঢলে পড়ছে।
যেন বাদামের খোসা ছাড়ানোর মতো আনন্দের কাজ
পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। পাশেই সিঁড়ির ওপর নতচোখে
বসেছে মাঝবয়েসী নির্লিপ্ত দম্পতি। ওদের চোখের নিচে
অবসন্ন বিকেল লেগে আছে গাঢ় হয়ে। এভাবে দুটো যুগলের চোখমুখে
মেঘ এবং রোদের যৌথভূমিকা আমাকে ভাবিয়ে তোলে;
তখনই কাঁধের পাশে হেসে ওঠে অদেখা চিত্রকর।
গুপ্তঘাতকের মতো সে ফের আসে। সহস্রাব্দজুড়ে শুয়ে থাকা
হৃদয়ের নিথর মমির পাশে রোজ সে গুচ্ছ গুচ্ছ গোলাপ রেখে যায়।
চিত্রকরের হাসিতে প্রৌঢ় দম্পতির বয়েস কমতে কমতে তারা একসময়
পানকৌড়ি হয়ে উড়ে যায়। মাঝবয়েসী নারী ও পুরুষের নির্লিপ্ত বিকেল
ততক্ষণে বরফ হয়ে গেছে এবং আমি—
যেহেতু চলে যাব বলে মনস্থির করেছি, মমির ভেতর থেকে উঠে
এক পশলা স্নিগ্ধ জীবনের দিকে ক্রমাগত হাঁটতে থাকি।
এদিকে...
আমার ছন্দাক্রান্ত পায়ের নিচে রাতভর অজস্র গোলাপ খুন হয়ে যায়।























