মাসুদ খানের ৭ কবিতা
প্রকাশিত : জুন ১৩, ২০১৯
পূর্বাভাস
যখনই যেখানে দেখা হয়ে যায় অতর্কিতে তোমার-আমার,
তাকাও আড়চোখে— দ্রুত, চোরাগোপ্তা, এবং ধারালো।
আর তাকিয়েছ যতবার,
ততবারই ছুটে গেছে একটি করে স্পন্দন, দুস্থ হৃৎপিণ্ডের আমার।
এভাবেই, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই, কমে আসে হৃৎস্পন্দ
দেখা দেয় নিম্নচাপ, ঘন-ঘন পূর্বাভাস— কুলকীর্র্তিনাশা জলোচ্ছ্বাস...
ক্রমেই উত্তাল হয় ভূমধ্যসাগর
অচিরেই ভেসে যায় যা-কিছু স্থাবর, অস্থাবর।
ব্রত
ত্যক্তজীবিতের মতো ঘুরছে ভবঘুরে
অনিঃশেষ ক্ষুৎপিপাসা নিয়ে, বনে উপবনে, তাপক্লান্ত দুপুরের রোদে।
বেলা পড়ে এলে, অবশেষে,
অবসন্ন দেহটিকে টেনে টেনে ফিরে আসে বনচর, স্তব্ধ লোকালয়ে।
সারাদিন মাধুকরী শেষে
যেমন দিনান্তে যার যার মতো ফিরে যায় যোগিনী ও মধুকর,
পরিশ্রান্ত বস্ত্রবালিকারা ফেরে নির্বাক যুগের চলচ্চিত্রের মতন।
ঠিক সে-মুহূর্তে
প্রভূত খেচরব্রত সেরে
রাজসিক কেতায় কোথাও-না-কোথাও
নেমে আসে রাশভারি উড়নজাহাজ।
রসায়ন
কুমির যা-কিছু খায়, সেসবও কি পরিণত হয় কুমিরে?
—জালালউদ্দিন রুমি
মন-মেদুর-করা সুর তুলত এক রাখাল।
বাঘে খেয়েছিল তাকে, বহুদিন আগে।
দিনে-দিনে সেই বাঘ কেমন উদাস, আনমনা, অহিংসপ্রায়
গোলপাতার আড়ালে আড়ালে...
দুর্ধর্ষ এক দস্যু— লুটেরা, নৃশংস, খুনি ও ধর্ষক।
খেয়েছিল তাকে এক বাচ্চা বাঘে, বহুকাল আগে।
বড় হয়ে সেই বাঘ এখন বনের সবচেয়ে আগ্রাসী, সবচেয়ে হিংস্র শিকারি।
তারপর একদিন
উড়ন্তপ্রায় হরিণের হলকুম কামড়ে ধরার ঠিক তুঙ্গ মুহূর্তে
দপ করে নিভে যাবে দাউদাউ নৃশংস হৃদয়,
শূন্যের মধ্যেই একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে-ওঠা উন্মত্ত বাঘের।
জাদু
কে যে কার আগে চলে যাব
তুমিও জানো না, আমিও তো তা-ই।
যদি আমি আগে যাই, থাকবে না কোত্থাও কোনো অনুতাপ
আমার তো আজন্ম স্বভাব, শখ, ছড়িয়ে পড়ার!
কণা-অনুকণা হয়ে ছড়িয়ে যাব ধীরে ধীরে
মনোরম জলবায়ু হয়ে ঘিরে থাকব তোমাকে।
আর যদি তুমি আগে যাও,
প্রকৃতিশাস্ত্রের সব বিধি ব্যর্থ করে দিয়ে
তোমার বেরিয়ে যাওয়া অভিমানী প্রাণবায়ু স্নিগ্ধ পরমায়ু
মুহূর্তের মধ্যে আমি ফিরিয়ে আনব
ঠিকঠিক তনুতে তোমার।
আমি জন্ম-জন্মান্তর সাধনায়
আয়ত্ত করেছি এই প্রাণ-ফেরানোর জাদু, করণকৌশল।
পরমা কথা বলে ওঠে প্রকৃতির ভাষায়
তোমাকেই নিগড়িত করবার সমস্ত কৌশল
ভানুমতি ভোজবাজি সব রপ্ত করেছে মানুষ।
আর মেয়ে, নিগড়কে তুমিও নূপুর ভেবে
মাঝে মাঝে পরে ফেলছ পায়ে।
বলো মেয়ে, মন খুলে আজ বলে যাও সব,
চুপচাপ শুনে যাব, প্রতিবাক্য করব না কোনো।
আমি কথা বলব মুদ্রণপ্রমাদে-ভরা খরখরে গদ্য-জবানে
প্রত্যুত্তরে তুমি বলে যাবে অনর্গল
বরফ-গলানো এক পরিস্রুত প্রকৃতি-ভাষায়,
সরলসার, সুললিত চারুপদ্যে—
‘নারীরূপে আসতে যদি ভবে
বুঝতে তুমি দুঃখজ্বালা তবে।
পেতে যদি ভূমিকা নারীর,
বুঝতে কী দায় কাঁধে প্রকৃতির!
বলতে পারো কোথায় তোমার থেকে
পিছিয়ে ছিলাম কখন এবং কবে?
হাজার বছর ধরে
জঞ্জাল সাফ করে
গড়েছি এই মানবসমাজ তবে।
দিনে দিনে করেছ তা জটাজটিল কাঁটাবহুল
আগাছা-সংকুল।
তাই তো দিতে হচ্ছে এখন নিত্যনতুন ভুলের মাশুল
আরো অধিক ভুল।
উজিয়ে এলাম হাজার বাধা, হাজার দমন দলন
আবার বাধা, আবার দমন, আবার পদস্খলন
এমন করেই এগিয়ে গেছি, আজও আগুয়ান
ধারণ-সহন-প্রাণশক্তি প্রকৃতির সমান।
প্রকৃতি যা, এক অর্থে পরমা-ও তো তা-ই
বিভেদ ছেড়ে এই আমরাই অভেদটা শেখাই।
প্রাণকে ফোটাই। স্তন্য দিয়ে, অন্ন দিয়ে করি বিকশিত
তাপ ছায়া আর মায়া মেখে, জীবন ঘষে করি উজ্জীবিত।
একাধারে প্রজায়িনী, প্রাণপালিনী, এবং প্রশিক্ষক
অন্নদা ও স্তন্যদায়ী, প্রাণশক্তি-আয়ুর উদ্বোধক।
স্নেহশাসন, প্রীতিবাঁধন, পালনপোষণ... সবই অবিরত
সাধন করি। সর্বোপরি পালন করি ব্যবস্থাপন-ব্রত।
পরমাকুল আমর্মমূল নিজেই তো প্রকৃতি।
প্রকৃতিকেই শেখাচ্ছ আজ স্বভাব, সংস্কৃতি?
দায়িত্বজ্ঞান, রীতিনীতি, প্রেম, প্রজ্ঞা, প্রীতি?
কালে কালে ঘোর সংকট ঘুরে-ফিরে আসে
আজ ফের সেই দুঃসংকেত ভঙ্গুর সমাজে।
মর্দানি-ভাব দমিয়ে রেখে জাগাও নারীভাব
ভেতর-বাহির বোধন ঘটাও প্রকৃতি-স্বভাব।
জেনে রেখো, চিড়-ধরা এই সমাজ-সারাই কাজে
হন্যে হয়ে ফিরবে শেষে নারীভাবের কাছে।’
এ-নিস্তারহীন ক্রূর কাঠ-ফাটা কঠোর রোদ্দুরে
এক মহাচ্ছায় গাছের গোড়ায় ঠেস দিয়ে
কিছুটা থতোমতো খেয়ে, হতভম্ব হয়ে
চুপচাপ অনুভব করে যাব প্রকৃতির এই কণ্ঠস্বর, এই পরিস্রুত ভাষার আগুন।
মা
এই ধূলি-ওড়া অপরাহ্ণে,
দূরে, দিগন্তের একেবারে কাছাকাছি
ওই যে খোলা আকাশের নিচে একা শয্যা পেতে শুয়ে আছেন,
তিনি আমার মা।
দূর্বা আর ডেটলের মিশ্র ঢেউয়ে ঘ্রাণে রচিত সে-শয্যা।
নাকে নল, অক্সিজেন, বাহুতে স্যালাইন, ক্যাথেটার—
এভাবে প্লাস্টিক-পলিথিনের লতায় গুল্মে আস্তে-আস্তে
জড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।
শয্যা ঘিরে অনেক দূর পর্যন্ত ধোঁয়া-ধোঁয়া
মিথ্যা-মিথ্যা আবহাওয়া।
মনে হলো, বহুকাল পরে যেন গোধূলি নামছে
এইবার কিছু পাখি ও পতঙ্গ
তাদের উচ্ছল প্রগলভতা
অর্বাচীন সুরবোধ আর
অস্পষ্ট বিলাপরীতি নিয়ে
ভয়ে ভয়ে খুঁজছে আশ্রয় ওই প্লাস্টিকের ঝোপঝাড়ে,
দিগন্তের ধার ঘেঁষে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন মাতৃছায়ায়।
উচ্চতর বাস্তবতা
মায়েরা মৃত্যুর পর দেহ ছেড়ে চলে যান অজানা বিদেহপুরে।
তারপর প্রতিদিন ওই ব্যস্ত বিদেহনগর থেকে এসে
ঘুরে ঘুরে দেখে যান যার-যার ছেড়ে-যাওয়া সোনার সংসার।
অন্তত প্রথম ত্রিশ দিন।
কী করছে আহা সোনামণিরা তাদের,
কেমনই-বা কাটছে ওদের দিন, মাতৃহীন
বিষাদবাতাস, বাষ্পঘন দীর্ঘশ্বাস
ফাঁকা-ফাঁকা ঘরদোর, আশপাশ
মায়ের অভাবে উঠানের কোণে বিষণ্ণ দাঁড়ানো জবাগাছ।
নবমৃত মায়েদের কি-জানি কেবলই মনে হতে থাকে
বেঁচেই আছেন তারা সংসারে, হয়তো
সংসারেরই ভিন্ন কোনো সম্প্রসারে, ঘুমঘোরে,
অন্যতর মায়ায়, আবেশে।
যেমন জন্মের অব্যবহিত পরের দিনগুলি...
নবজাতকের কাছে
বোধ হতে থাকে যেন সে রয়েছে তখনো মায়েরই গর্ভকোষে।























