মাসুদ পথিকের একগুচ্ছ কবিতা

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৯

বসন্ত এসে গেছে

তথাপি এই বাক্য আমিও বলছি, ‘বসন্ত এসে গেছে` সখি,
বসন্ত এসে গেছে,
শিমুলের ডালে ফুটেছে ফুল,

গান গায় আমার হৃদপিণ্ড থেকে উড়ে যাওয়া মধুকুপি
আর কিছু ভুল
ক্রিয়া ও সম্প্রদানে তুমুল!

ধানবানা মেয়ে, ও ঘরলেপা মেয়ে, তোকে বলছি, চুপিচুপি
বাড়ির পেছনের বাদার জঙ্গলে তোকে এনেছি টেনে,
সখি ওই দেখ বসন্ত এসে গেছে,

আর তুই এঁকেছিস ঘরের মেঝেতে ফুল, চর্যার ডোম্বীর দেহ ভাঁজ,
জনশ্রুতির বলিরেখায় প্রেমিকের করুণ লাশ
ঘরের মেঝেতে, একেঁছিস কফিন, বিরহের অনুষঙ্গে,
মৃদু যতিচিহ্নের ’পর গ্যালাক্সির গলিমুখ

আমিতো যাইনি ওপারে, যদিও সেখানে মৃত্যুকে বুকে ধরে
ভালোবাসা গেছে ঝরে,
আমি তো শূন্যকে তোর দেহ থেকে কুড়িয়ে বুনেছি ক্ষেতে
আর আমি শূন্যের পেটে জন্মেছি ধান হয়ে

তবে কী তুই ভেবেছিস আমি গিয়েছি মরে?
ওই ক্ষেতে ক্ষেতে ধান ফলাতে ফলাতে

সখি তোকে ধান ভেবে, প্রিয় তোকে ধান জেনে
করেছি চাষ বুনেছি নির্জনে, অনন্ত কাঁদাজলে আবহমান

আমি কখনো যাই না মরে এইসব বসন্তে অম্লান আবহে
প্রতিবারই ফসলের লোভে আসি ফিরে
তোর ঘরে, প্রেমিক ও সন্তান হয়ে

সখি দেখ, বসন্ত এসে গেছে কামনা বাহিত প্রকারে
অতএব সকল প্রাণের পুনোত্থানে আর অব্যয়ে অব্যয়ে

ও ধানভানা মেয়ে ও ঘরলেপা মেয়ে
চল আজ আগুনে ভিজে ভিজে উঠি গান গেয়ে

বর্ণের বক

তপাথি তথাপি এইভাবেও জানা যায়
ফালগুনের সমবেত কাহিনি
আর শোকসারি

শাসন করে সময় সারস মুহূর্তের ঢেউগুলি,
অনুভবগুলি অতীতে নিয়েছে বাঁক
যখনই;

জনপদ ত্রস্ত, আত্মপরিচয় হচ্ছে লুট
রাজপথে এসে গেছে কিছু নখর ও বুট
কথিত শকুন পরধন লোভি চোখ
ভোক্তার শিকারি

তথাপি এসে যায় জনতা, এসে পড়ে কথকতা
আপন ভাষার দেশে, গর্জে ওঠে নীরবতা

অ-র জ্বর, আ তাই কাঁদছে
কেননা ওরা সহোদরা
বর্ণমালার সংসারে গা থমথমে বোধ
আর পথে ছড়ানো ছিটানো অনাহারী রোদ

কাঁদছে অক্ষর, বাক্যেরও সারা দেহে রক্ত
বাকিরা অনেকেই অভুক্ত
ফলে পাঠগুলো ভীষণ ক্ষুব্ধ
ইতিহাস তাই স্লোগান অনুরক্ত

র, স, জ, ব আরো নাম না-জানা বর্ণ
রাজপথে হলো শহিদ
এইখানে ধীরে ধীরে রক্তের বায়ু ছড়ায় দিগন্তে
স্মৃতি সব চেতনায় পাতাপত্রলীন

শাদা বক বর্ণ মালার মতো অঙ্কিত শূন্যে, অনুভূতি
দিবে ডুব, শূন্যে অন্তহীন এবং খুব
ভাষা আজ গায় গান, পাখিও নয় নিশ্চুপ

একজন পরিত্যক্ত লাঙলের ব্যথা

তথাপি কৃষিবিষয়ক এক সেমিনার গিলে খেলাম, কেননা আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম।
ক্ষুধার্তই থাকি প্রায়শ, কেননা আমি বেকার
আমার যোগ্য কোনো কাজ নাই।

আমি একটাই কাজ জানি, চাষ দেয়া, যা আমি আমার বাবার কাছে শিখেছিলাম।
আর বাবা দাদার কাছ থেকে, দাদা তার বাবার কাছে।
এইভাবে হাজার বছর ধরে চাষ দেয়াই আমার পেশা।

আর আমরা ক্ষুধার্তই থাকি, ফলে আমরা মাছের মতো একে অপরকে খেয়ে খেয়ে না-খেয়ে বাঁচি।

যেমন আমি বাবাকে খেয়ে ফেলেছি, বাবা দাদাকে, দাদা তার দাদাকে।
এরকম খেতে খেতে খেতে শহরে এসে পৌঁছালাম, এই ফুটপাতে।

চায়ের সঙ্গে ফলের সঙ্গে ফরমালিন খাই।
পিপলের দ্বীর্ঘশ্বাসের খাদ্যগুণ বেশ, খাই।

আর প্রেয়সীর অবহেলা খেতে খেতে আমি নিজেও অবহেলায় রূপান্তরিত।

অতএব আমি ক্ষুধার্ত আর অবহেলিত হতে হতে ডাস্টবিনে পর্যভূষিত।
আমি এখন খাই কুকুরের সঙ্গে, মেধাহীনভাবে।

কেননা আমি নান্দীপাঠের নামে লালন, ফুকো, দেরিদা, ইয়ং, ফ্রয়েড,
মাকস, সার্ত্রে, হাইডেগার, কিয়েরগার্দ, গদার, ব্রঁসর, গুণে
এইসব খেতে খেতে পেটে পীড়া হয়েছে গেছে।

সো এখন শহরের সুশীল সেমিনারগুলোই খেয়ে নিই ক্ষুধা পেলে।

আজ এক নিঃসঙ্গ লাঙলের আত্মকথা পড়তে পড়তে ঢুকে গেলাম আধুনিক কৃষিবিষয়ক সেমিনারে।
এই পাঠ সিলেবাসের পাতায় পরিত্যক্ত কাগজে পেলাম কুড়িয়ে, ঝালমুড়ি খেতে খেতে।
হলরুমে ঢুকেই ওই সুশীল আলোচকদের দেখে আমি হলাম ভীষণ ক্ষুদ্ধ,
ক্ষুধা চাগিয়ে উঠলো, খেয়ে নিলাম সব ক`টাকে ঘাড় মটকে মটকে।

তবে আমি নিজেই এক আদুরে লাঙল। বাবার যাত্নে গড়া প্রিয় লাঙ্গল। দাদারও।
সব গিলে খাবার পরও আমি পরিত্যক্ত। কেননা আমি কেবল এক ঐতিহ্যের নাম মাত্র।
প্রকৃত আমি পরিত্যক্ত লাঙলের ভগ্নদশা নিয়ে গিলে খাই নিজেকেও, আর আমার সকল প্রচল শিক্ষা, প্রকরণ।
এবং হীনমন্যতা।

আর হেঁটে যাই আল্লাহর দিকে, ভগবানে পড়ায়, আর যা যা গন্তব্য আছে গরীবের। থাকতে পারে।
যদি ফিরে পাই নিজের আত্মপরিচয়, চাষা।

আমি তো সেই সুবর্ণ চাষা, ১৩ হাজার বছর বেঁচে আছি এই ডেল্টায় লাঙল হয়ে, জোয়াল হয়ে, আঁচড়া, নিড়ানি, আরো এইসব হয়ে না-হয়ে।

আর তুমি বা তোমরা আমাকে ভিক্ষুক জেনে দু পাঁচ টাকা ধরিয়ে দিয়ে যাও, গেলে হাতে, দাও।
ট্রাক্টরের শব্দে কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়া কোনো ভোরে লাঙল আমি,
দেখি জেগে কাটিয়েছি রাত পরিত্যক্ত গোয়ালঘরে।
ফলে আমি আমাকে সবটা খাই, যতোটা আছে অ-যুক্তির প্রযুক্তি, কিংবা আবহমান ছাগল।
যে ছাগল নিজেই নিজের দড়িয়ে খেয়ে নিয়েছে সাপ ভেবে।

খাই। খাই। খাই
আমি লাঙল, মাটির যোনিতে লুকাই। অবহেলার যোনিতে জন্ম দিই সোনালি শস্য, প্রেম। প্রকৃতি প্রেম।