মাসুদ পথিকের ৫ কবিতা

প্রকাশিত : মে ১১, ২০১৯

ইতিহাস ৫

হ্যাঁ, ইতিহাস একটি কচ্ছপই। কচ্ছপটি আমার দাদা দেখেছিল
পরিত্যক্ত গোরস্থানে, কবরে। প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়েছিল যুবতী কচ্ছপ।
অবৈধ গর্ভপাতের লজ্জা থেকে বাঁচতে গাবগাছের ডালে মরেছিল।

আর বাবা দেখেছিল বিলের কিনারে,
দেশবিভাগের কদিন পর,
হাতছাড়া হয়ে যাওয়া জমির আলে হাঁটছিল কচ্ছপ।
গাঁয়ের লোকেরা বলেছিল সমীরণ দাস ইঁদুরের বিষ খেয়েছিল,
কচ্ছপ হয়ে গিয়েছে সর্বস্ব হারানোর ব্যথায়।

আমি তো হাত কেটে রক্ত-লেখা শেষ চিঠির রাতে পলা`দের ঘরের পেছনে
হাঁটতে দেখেছিলাম কচ্ছপকে।
তারপর কচ্ছপ হেঁটে পেরিয়ে গেছে কাঁটাতার। সীমান্ত।

আমার ছেলের ব্যাপারটা একদমই আলাদা
সে কচ্ছপ দেখেছিল সর্বত্র
ফুকোর যৌনতার ইতিহাসে, ইয়ং`র স্বপ্ন প্রতীকে, ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণে।
তার কাছে কচ্ছপ মূলত যৌন মোহন।

অতঃপর নাতি, সম্প্রতি সে কচ্ছপের পেছনে ছুটতে ছুটতে
সাইবার স্পেসে পৌঁছে গেছে,
দেখে যে ইতিহাস মূলতই কচ্ছপ, এবং কচ্ছপই ৭০ হুর হয়ে সেবা দিচ্ছে, তার মনিবকে।

আমার নাতি এবং আমার দাদার দেখা সেই মুগ্ধ যুবতী কচ্ছপটিকে
দেখতে পেল একদম নগ্ন, এবং ইতিহাসের পোশাকে, মাধুর্যে।

নীল ২

হে নীল, করুণা নিতে আসিনি
কেবলি কেবলি ডুবে যাচ্ছে নীলিমার দুটি পাড়
চোখের সমুদ্রে বারবার

এইখানে, এখানে অনন্ত জল লুকোনো
আগে তো বুঝিনি, কেন?

নীল ওই দুটি চোখ নিয়ে যাচ্ছে অতলে
ফলে,

নুন এসে জাপটে ধরছে দেহ
উতাল ঢেউয়ের সমুদ্রে আহত হইনি কি কেহ?

ও`সু নীল, আমি ভিক্ষে নিতে আসিনি
ভালোবাসা ভরা আমার এই মনো-দেহ
ব্যথায় চুবিয়ে মা আমার আঁতুরঘরেই আকীর্ণ করেছে কামনা ও স্নেহ!

নাভিতে বুনেছে উজ্জ্বল ধানবীজ, আর হৃদয়ের শ্রমে
জানিস ভাতমাছের নিশ্চয়তা আছে আমার এই প্রেমে

ধাত্রী যদিও,পালিয়ে গেছে দিনের আলোয়, নীলে
কেউ বলে তার লাশ দেখা গেছে পিছারার বিলে

আমিও হইছি কী জন্মান্তরে অন্ধ, লীন
তোর কপালে উড়ানো, ব্যথিত শঙ্খচিলে, শঙ্খচিলে...

পাখিজন্ম ৫

অতএব যদি সুযোগ পেয়েই যাই
তবে পাখিই হবো
ঠিক ভাত-শালিক হয়ে জন্মাবো আবার

উড়বো, উড়ে বেড়াবো, সেসব জায়গায় কখনো ঢুকতে পারিনি জীবনে
পলা`দের বসতঘরে, ধর্মের দেয়াল তুলে রেখেছিল তারা
এবং পারিনি পেরোতে সীমান্তরেখা, কাঁটাতারের বেড়া

পাখি হলে সীমান্ত রক্ষীর বন্দুকের গুলি তাড়া করেও
পারবে না ফেরাতে

মনে পড়ে খুব করে লিখেছি যত বিরহবর্ণিত কবিতা
পলা`কে ঘিরে আছে কত না স্মৃতিকথা
সেই শৈশবে পলারা কি কারণে চলে গেছে দেশ ছেড়ে?

ভাবি, পাখি হলে পলা`কে পাব খুঁজে নিশ্চয়

তবে পাখি হলেও বৃক্ষের ডালে বাঁধবো না নীড়
ঝড়ে পড়বে ভেঙে আর
খোড়লে বাঁধবো সংসার
কোনো দরদি চাষার আঙিনার পেছনে হবে সে বৃক্ষ

পাখিদের বিবাহের বিধি নাই
থাকে না ধর্মের কোনো দেয়াল

প্রেম হয় মুক্ত, উড়ে উড়ে খুঁজবো মননের তরঙ্গ
যখন চাষা করবে চাষ খুঁটে খাব মাটি ও পতঙ্গ
আর চারদিকে ছড়াবো কলতান

পছন্দ মতো করবো সহবাস, অথবা করবো অবাধ সঙ্গম
একদিন উড়ে না-উড়ে যাব হারিয়ে, কোথাও

কারো কোলে ফিরেও আসবো না,
সত্যিই পেরিয়ে যাব আরো কিছু মহাকাল;

ঠোঁটে নেব জলিধানের বীজ, গর্ভে প্রেয়সীর ক্রোমোজম

বিবাহ গিমিক

আমি বিবাহ করিনি, এই বাক্যের ভেতরে ভেতরে
যত যত স্পেস তত তত কচ্ছপ ঘুমায়,
ট্যাবুর ছোট বড় বাচ্চা।

এই, এমন কোনো দুপুরে... ভাদ্রের তালপাকা গরমের পর
হঠাৎ বৃষ্টি ঝেপে এলো সেদিন,
ক্ষুধার্ত কচ্ছপ উঠে এলো বসতঘরের ভেতর

আর
ঘ্রাণ ফলো করে করে কচ্ছপ চলার রাস্তায় জমায়েত হলো পিঁপড়ে
গড়লো অভিমানের সঞ্চয়, সংস্কারের পাহাড়

মা বারান্দায় ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে শুঁকনো মরিচের পুটলা
দিদির শাড়িটিও মৃদু ভেজা
বর তার লাপাত্তা

তবুও কেউ কাঁদছে কাচারি ঘরে আজ
শব্দের স্পেস জুড়ে কান্নার ধ্বনি কচ্ছপের মতো করছে এঘর-ওঘর

আর তৈরি হচ্ছে জালের মতো যৌথ বাক্য
কেননা আজ মেঘলার বিবাহ উৎসব
মেঘলা গাঁয়েরই মেয়ে
প্রেমিক তার অ`জাতীয়, বিচ্ছেদের পদচ্ছাপ

যদিও কান্নার শব্দের ফাঁকে ফাঁকে কচ্ছপ দিচ্ছে মিথের দিকে লাফ
গাঁয়ে আজ বৃষ্টি হচ্ছে এনাফ

গল্পের চোখ ভিজে ভিজে একাকার
জলে দিচ্ছে লাফ খুব প্রচল জৈব শোল মাছ!

ভিজে না-ভিজে ‘আমি বিবাহ করিনি’
বাক্যটি ফিরে যাচ্ছে, যাচ্ছে মাতৃতান্ত্রিক সমাজের দিকে
রাস্তাঘাট কাঁদাকাদা, বয়ে চলা টাফ