রওশন আরা মুক্তার ৫ কবিতা

প্রকাশিত : জুলাই ১৩, ২০১৯

মেট্রিক্স-মেট্রন

সন্ধ্যা নামে ব্রহ্মপুত্রে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে সারি-সারি বাতি জ্বলে ওঠে।
বিদ্যুৎ! বিদ্যুৎ! তা-ই—যা পাচার হয়ে থাকে শ্বাপদ শহরে।
আলতো মৃদু উপস্থিতি, বিন্দু বৃত্ত নদী আর শহর আমার
বেশ্যাবৃত্তি করতে লেগে যায়—কে সে? অন্ধকার নামক খদ্দের।
ঐ দ্যাখো লোকাতীত কাশবন; আমাদের কৌমুদীবিলাস,
কেরোসিন-বাতি নৌকা, রাত-জাগা ঝিলিমিলি রুপালি বিছানা।
ঐশ্বরিক আর খুব প্রাকৃতিক। ব্রহ্মপুত্র আমার, জানো?—না?

বেঞ্জামিন-উপজাত ধনাত্মক ঋণাত্মক বিদ্যুৎ-বর্তনী
কর্পোরেট বালাখানা পরকীয়া করে সেই আলোর বিভবে।
দশ মাথা শত চোখ, তুমি দুটি পায়ে স্থির দাঁড়িয়ে, হারিয়ে
যাচ্ছ; খাচ্ছ হাবুডুবু সে সকল আলোকের শ্লৈষ্মিক ঝিল্লিতে।
ভিজে যাচ্ছে, পিছলে যাচ্ছে গা তোমার, আলোপ্রেমী তমিস্র কুমার।
ডুবে যাচ্ছ লাল নীল বাতিজ্বলা বিদ্যুৎকেন্দ্রের আলেয়ায়,
গুলে যাচ্ছ, খুলে খুলে যাচ্ছে শুধু স্বর্ণেমোড়া তোমার শরীর।

তোমার ঐ দশ মাথা শত চোখ একটিমাত্র মাত্রায় থিতানো,
অবশেষে ঊর্ধ্বশ্বাস অপলাপী অপরাধী আমার তমিস্রা—
তুমি খোঁজো চাষযোগ্য মাটি, খোঁজো আদিতমা রমণী-রজনী
খোঁজ তুমি পরিত্যক্ত দ্বীপ, তাতে যেন আমরা কপিলা কুবের!
হায়! গুহামানবের শুঁকে-চলা প্রবণতা খুঁজিছ, নাগর,
চকমকি পাথরে তুমি জ্বালবে রাত—যাও কোন জীবন বয়নে?
ফিরে যাচ্ছ, ফিরছ তুমি আদিপিতা, ফিরছ গুহাজীবন যাপনে।

পরীক্ষা

আপনার আপনার আত্মার ভিতরে
লিখে দিয়া মস্ত মস্ত চিঠি
আমরা সই করলাম তার নীচে নীচে
তোমারেও দিতে হবে হে এই বিচ্ছেদী পরীক্ষা
মন চাইলে আমিও নিজেরে নিয়া খাড়া করাইতে পারি ফসলের মাঠে
হাত দুইটা উঠাইয়া কাকতাড়ুয়ার সারেন্ডার ভঙ্গি করে দাঁড়াইতে পারি
তবুও আমায় ভয় পাইতে থাকবে অবলা কিছু পাখি, কাক টাক চিল
আত্মার ভিতরে আমি আবার তালাক দিব আপনাকে
একবার দুইবার বারবার
তালাক দিতে থাকব
আপনার চোখের ভিতরের শূন্যতা
ভেদ করে আমি দেখব
আপনার মগজের ভিতরের সংখ্যার ভিতরে দেখব
আপনার হৃদয়ের রক্তে হাত লাল করে দিয়ে দেখব
আপনার বুক থেকে পেট ছুড়ি চাকু দিয়া কেটে
সব বের করে নিয়ে জলে ধুয়ে আবার সেলাই করব
আবার আমি আপনাকে তালাক দিয়া ফেলব

গুড নাইট

গুড নাইট হে পৃথিবীবাসী গুডনাইট
গুড নাইট হে ভাসমান হাতিয়া গুড নাইট
গুড নাইট আধাপাকা প্রেম গুড নাইট
গুড নাইট কাঁথা-কম্বল, বিদেশি পুতুল, গুড নাইট
গুড নাইট গিলে ফেলা ব্যথা-কথা, গুড নাইট
গুড নাইট গল্প, গল্পের বই; গুড নাইট
গুড নাইট দুধ চা, সাদা সোনাপাতা, গুড নাইট
গুড নাইট কবিতা, ফালতু কবি, গুড নাইট

এক সাথেই তো

পাশাপাশি শুয়ে না ধরাধরি করলাম আমরা
ঘুমের ঘোরে একটু মানবিক পরশ হইল মাঝেমাঝে
চুপচুপা অন্ধকারে তোমারে স্বামী মনে হইল এক পলক
চুপচুপা অন্ধকারে আমারে নারী ভাবলা মনে এক ঝলক
এরপর সব চুপ, আমরা চেষ্টাও তো করলাম কত!
তবুও চুপ।
এইভাবে অনেক অনেক দিন পর
একদিন সকালে দুইজন দুইভাবে দুইমনে ঘুম থেকে জাগলাম
দুইজনে যার যার দুই পায়ে দুই ধরনের রাস্তায় দুইভাবে হাঁটলাম
হাঁটলাম অনেক অনেক দূর
যেন আর চলার শেষ নাই

সুরমা

তোমায় সাজাইতে আমি হলাম সুরমা পাহাড়
একবার সত্যের মতোই অমোঘ কিছু কী একটার ঝলকে
পুইড়া গেছিল যে কালো পাথর
ধূসর হয়ে যাওয়া আমায়, গুঁড়াগুঁড়া করে সাজাও
পিতলের দানীতে সাজাইয়া রাখো আমায়
নিজেরেও সাজাইবা তুমি

বাইরে যখন যাও
কেউ যখন আগ্রহভরে অপেক্ষা করে তোমার তরে
কেউ যখন ডাকে প্রিয় তোমারে
আর যখন থাকতে পারো না ঘরে
শো শো শব্দের সেইসব রাস্তার ধারে তুমি যাইয়ো

আমারে একটু লাগাইয়া নিয়ো তোমার চোখে
আমারে একটু দিও প্রেমের বা জীবনের স্বার্থকতা
পুড়ে গেছি, তবুও যদি তুমি দেখতে পারো অমোঘ কিছু

আমায় একটু লাগাইয়া রাখো চোখে
আমায় চোখের পানি দিয়া ধুইয়া দিয়া
আবার চোখে লাগাইয়া
আবার চোখের জলে ধুয়ে
রাস্তাঘাটে ধূলার মতো আমায় বিলাইয়া বিলাইয়া
সত্যটা দুনিয়ার আকাশের নীচে একবার শুধু বইলো, প্রিয়!