রুবাইয়াৎ-ই ওমর খৈয়াম

পুনর্মুদ্রণ

অনুবাদ: কাজী নজরুল ইসলাম

প্রকাশিত : মে ১৮, ২০১৯

এক.
রাতের আঁচল দীর্ণ করে আসলো শুভ ওই প্রভাত,
জাগো সাকি, সকালবেলার খোঁয়ারি ভাঙো আমার সাথ।
ভোলো ভোলো বিষাদ-স্মৃতি! এমনি প্রভাত আসবে ঢের,
খুঁজতে মোদের এইখানে ফের, করবে করুণ নয়নপাত।

দুই.
আঁধার অন্তরীক্ষে বুনে যখন রূপার পাড় প্রভাত,
পাখির বিলাপ-ধ্বনি কেন শুনি তখন অকস্মাৎ?
তারা যেন দেখতে বলে উজল প্রাতের আরশিতে
ছন্নছাড়া তোর জীবনের কাটল কেমন একটি রাত!

তিন.
ঘুমিয়ে কেন জীবন কাটাস? কইল ঋষি স্বপ্নে মোর,
আনন্দ-গুল প্রস্ফুটিত করতে পারে ঘুম কি তোর?
ঘুম মৃত্যুর যমজ-ভ্রাতা তার সাথে ভাব করিসনে,
ঘুম দিতে ঢের পাবি সময় কবরে তোর জনম-ভোর।

চার.
আমার আজের রাতের খোরাক তোর টুকটুক শীরীন ঠোঁট
গজল শোনাও, শিরাজী দাও, তন্বীসাকি জেগে ওঠ!
লাজরাঙা তোর গালের মতো দে গোলাপি-রঙ শরাব,
মনে ব্যথার বিনুনি মোর খোঁপায় যেমন তোর চুনোট।

পাঁচ.
প্রভাত হলো, শরাব দিয়ে করব সতেজ হৃদয়পুর,
যশোখ্যাতির ঠুনকো এ কাচ করব ভেঙে চখ্ নাচুর।
অনেক দিনের সাধ আশা এক নিমেষে করব ত্যাগ,
পরব প্রিয়ার বেণী বাঁধন, ধরব বেণুর বিধুর সুর!

ছয়.
ওঠো, নাচো! আমরা প্রচুর করব তারিফ মদ-অলস
ওই নার্গিস্ আঁখির তোমার, ঢালবে তুমি আঙুর-রস!
এমন কী আর-জদিই তাহা পান করি দশ বিশ গেলাস,
ছয় দশে ষাট পাত্র পড়লে খানিকটা হয় দিল সরস!

সাত.
তোমার রাঙা ঠোঁটে আছে অমৃত-কুপ প্রাণ-সুধার,
পেয়ালার ঠোঁট যেন গো ছোঁয় না, প্রিয়া ঠোঁট তোমার
ওই পেয়ালার রক্ত যদি পান না করি শাপ দিও,
তোমার অধর স্পর্শ করে বড় স্পর্ধা তার!

আট.
আজকে তোমার গোলাপ-বাগে ফুটল যখন রঙিন গুল
রেখো না পানপাত্র বেকার, উপচে পড়ুক সুখ ফজুল।
পান করে নে, সময় ভীষণ অবিশ্বাসী, শত্রু ঘোর,
হয়তো এমন ফুল-মাখানো দিন পাবি না আজের তুল।

নয়.
শরাব আনো! বক্ষে আমার খুশির তুফান দেয় দোলা।
স্বপ্ন-চপল ভাগ্যলক্ষ্মী জাগল জাগ ঘুম-বিভোল!
মোদের শুভদিন চলে যায় পারদ-সম ব্যস্ত পা’য়,
যৌবনের এই বহ্নি নিভে খোজে নদীর শীতল কোল।

দশ.
আমরা পথিক ধূলির পথের, ভ্রমি শুধু একটি দিন,
লাভের অঙ্ক হিসাব করে পাই শুধু দুখ, মুখ মলিন!
খুঁজতে গিয়ে এই জীবনের রহস্যেরই কূল বৃথাই
অপূর্ণ সাধ আশা লয়ে হবই মৃত্যুর অঙ্কলীন।