লাবণ্য শাহিদার ৩ কবিতা

প্রকাশিত : মার্চ ২৯, ২০১৯

চিঠির ভাষা

যে চিঠি দিয়ে তুমি হাজার নারীর আদর কেড়েছো
সে চিঠি দিয়ে আজ আমায় কিনতে এসেছো?
যে চোখের জলের মূল্য ছুড়ে ফেলে সাগর খুঁজেছ,
আজ এসে কি পাবে এই মরূদ্যানে!
তোমাকে মুক্তি দিয়েছি অজস্র আঘাত আর চোখের
জলের বরষায়!
তোমাকে ছেড়েছি হাতে রেখে এক আকাশ আর জোস্নাবিলাস মৌনতায়!
প্রত্যাখান করলাম সমস্ত জগতকে,
গুমড়ে মরে ভিতরটা আজ এক স্রোতহীন নদী!
এখানে আছে প্রেমিকের প্রহসন, যন্ত্রণা
আর নিষিদ্ধ তুমি!

ইছামতি স্টেশন

আজ প্রায় বছরখানেক পরে
শিমুল তুলোর গাছ পেরিয়ে
ইছামতি স্টেশন।

ঠিক পড়ন্ত দুপুরের ডগায়
আমার চোখ জোড়া ঢেকেছে মোটা ফ্রেমের দাগে।
ইচ্ছেগুলো ঝাপটে আসছে অনেক বছর আগের কথায়,
শেষবার অপেক্ষার সেই দিনক্ষণ
না, ভুলিনি একবিন্দুও কিচ্ছুটি!
অভিনয়টা বরাবরই করে গেছি
ভুলে আছি যেন!
কিভাবে দেখতে দেখতে পঁচিশটা বসন্ত পেরিয়ে
ষোড়শীর সেই আবেগ কোথায় হারিয়ে গেছে
আর ভালোবাসার বিনুনি গেঁথেছে প্রাক্তনের দুয়ারে!

মনে আছে খুব,
সেবার কি ভীষণ শীত পড়েছিল শহরজুড়ে
সবুজ পাতা ঝরঝরিয়ে উলঙ্গসম গাছগুলিতে
আমার চোখে তখন টগবগে সব দারুণ নেশা
ভালোবাসার ঘর বাঁধা যেন রক্তিম আভায়!

নীলছে রঙের ব্যাগটা কাঁধে দাঁড়িয়ে ছিলাম স্টেশনে
চোখ জোড়া চাতকসম খুঁজছিলাম তোকে সাত সমুদ্রে
সময় বাড়তে কপাল জুড়ে বিন্দু বিন্দু ঘামের রেশ
আমার বুকটা চেপে কেমন যেন নিরুদ্দেশ।

গত রাতেই শেষ কথাতে
তুই বললি, ঠিক সময়েই থাকবি।
সবাই যাচ্ছে গন্তব্যে
কিন্তু একা আমি ভীষণ কাঁপুনিতে
অপেক্ষায় থাকি...

এভাবে অনেক সময় পেরিয়ে সন্ধে নামার পর
ভীষণ কষ্টে, অপমান আর ঘেন্না নিয়ে
বরণ করেছিলাম তোর কাপুরুষতাকে
একা ফিরতে ফিরতে...
না, তুই আসতে পারিসনি
তুই পারিসনি
পারিসনি!

আজ কয়েক বছর পেরিয়ে
শিমুল তুলোর গাছ পেরিয়ে
ইছামতি স্টেশন,
এখন চোখের কোণে কালি আর বয়সের দাগ
সাথে ক্রমশ বলিরেখার ছাপ।
আর চোখের কোণে জল লুকাতে ভীষণ স্পর্ধী আমি,
তোকে কাপুরুষতার চাদরে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখার মাঝে
দারুণ উত্তেজিত আমি ভিতরে ভিতরে
ভাবছি আজো তোর কাপুরুষতাকে জিতিয়ে দেব।

শুধু আবারো সেই মনে রাখার মতো ভালবাসাকে জাগিয়ে চলে যাব আমি,
যেন প্রতিবার আয়নায় প্রতিবিম্বতে তোর মুখ
দেখে ভয়ার্ত বিবেকে কাটুক তোর যুগ!
ভুলের আর্তনাদে কাটুক তোর লক্ষ রাত্রি,

আর পিছুটান ছাড়িয়ে যাব আমি বহুদুর!
ইছামতি স্টেশন।

বলশেভিকের লাল

শহরের যাবতীয় ক্লান্তি যখন ব্যস্ত সিডিউলের জ্যামে
নিয়ন আলোয় উষ্ণতা ফেলে প্রেম আছে আজো ঠিক বামে!

চারটে লাল ফ্রকে চোখ যখন নীলচে খুশিতে মাতে
ঈদ এসে ভিড় করে স্টেশনের বস্তির আসমা, রত্না, হিরু আর বাবরের কাছে
আজো আস্থাজুড়ে তেমনি আছে বলশেভিকের লাল

নতুন ভোরের আলোর মিছিলে যত আঠারোর টগবগে রক্ত
স্লোগানে মাতে ভুলে যতসব শাস্ত্র; বিশ্বাসের ভিতে আজো অম্লান কাস্তে!

প্রেমিকের ভালবাসা উড়িয়ে উষ্ণ চুম্বন আসে রোজ রাত্রে,
প্রেমিক বলতেই চোখে ভাসে ফিদেল ক্যাস্ত্রো!

সুষম বণ্টন হোক ফসলের ফরমানে দীক্ষা এই বাক্যে
আজো বিবেকই অগ্রাধিকারে থাকে আর সাম্যে!

আঁধারের বুক চিরে কাটুক ভুল
আসুন, হয় স্তিত এই মন্ত্রে,
মানুষ মাত্রই এক ভালোবাসাময় ফুল