শামসেদ তাবরেজীর কবিতা ‘বউ বড়ো ভাল রাজনীতি’
প্রকাশিত : ডিসেম্বর ১৭, ২০১৮
আমার বউ খুব ভাল মানুষ। নারী তিনি, আমার চেয়েও।
গতকাল আমার বউ আমাকে একজোড়া জুতা কিনে দিয়েছেন
আর দিয়েছেন সবুজ রঙের একটা হাফ সোয়েটার।
দিন-দুনিয়ার খবর নিয়ে এখন আমার টেনশন নাই।
যে যাকে পারে ভোট দেবে, যে যারে পারে ঠাপাবে।
কি করতে পারি আমি? কানাওলায় ধরা মন আমার,
পারতাম শোকগাথা লিখতে। কিন্তু লেখব না। তবে,
বউ আমারে বই কিনে দ্যান না। বলেন বই হইল পাপ।
গন্দমের আরেক নাম হইল বই। বলেন, আমরা তো
এর চাইতে বড় একটা পাপ কইরাই এই দুনিয়াতে আসছি।
আর কি লাগে! আমাকে সুপথে রাখার চেষ্টায় উনার শেষ নাই।
তারই কদরে আমি আজ তমিজের সাথে বসা শিখছি। শুইতেও।
আমি এখন জানি, বাহাত্তর হাজার নাড়ী একটি গিট্টুতে
কেমন আনন্দ হয়ে ওঠেন। নিশ্বাস এবং প্রশ্বাস এখন আমার কাছে
ঢাকা-টাঙ্গাইল বিরতিহীন বাস সার্ভিস। একটা ঝাকিও খায় না।
আমার বাড়ির সামনে এখন আর কোন কুত্তা পেচ্ছাব করে না।
কালা কি ধলা একটা বিলাইও দুধ চুরি করতে আসে না আর।
তবে, দরজার চিপা দিয়া প্রত্যেক দিন পত্রিকা আসে।
এ যেন ফজরকালের ইবাদত। আমি তার উপর বসে হাগু-বাসনা করি।
পত্রিকায় আমার বউ রাশিচক্র দ্যাখেন। শসা না ক্ষীরা কোনটা বেশি ভাল
এই নিয়ে গবেষনা করেন। জীবন মানেই জী-বাংলার সামনে
আমি দাঁড়ায়া গরম পানির কাটাকুটি খেলি, আমি সহজ হই। হা সহজ!
চিনির সুমিষ্ট শ্রোত একবার আমাকে উঁচাতে ওঠায়, আরেকবার
নামিয়ে দ্যায় দিকচিহ্নহীন শূন্যে। শূন্যেও অনেক বীর্য-পাথর ওড়ে।
আমার বউ এইসব জানে, তাই সর্বদা তৎপর থাকেন
যেন আমি নিদানের কালে অন্তত একটা কবিতার স্বপ্নের
মধ্যেই থাকতে পারি, সেই আশায় তিনি আমার বুকে-মাথায় ফুঁ দেন।
বুঝতে পারি, আমার মাথা ধীরে-ধীরে খারাপের দিকে যাচ্ছে।
মানবজাতির এই মাথা খারাপ হওয়ার নিয়তিকে তিনি অত্যন্ত সম্মান করেন।
তখন আমি কি করি কি করি সবুজ সোয়েটার গায়ে চড়াই আর
জুতা পরি অথবা পরিধান করি। ভোগলা হওয়া মোজাটা
চেপে রাখি আঙুলের জগমি মাথা দিয়া। তারপর আমি রওনা দেই,
দিতেই থাকি, দিতে দিতে সন্দেহ জাগে আমি বিবাহিত না অবিবাহিত।
তারও বহু-বহু আগে, সে-এক অতীতকালে রাজ্জাক ভাই একটা কালো গরম লোহা
আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আমি সেটা নিয়ে দেলদুয়ার
গেছিলাম। জ্বরে আমার গা পুড়ে যাচ্ছিল। তিনি মুখটা ব্যাকা করে বললেন,
বিড়ি খা, জ্বর চলে যাবে। চাঁদের নিচটা পার হবার সময় বিড়িটা খাইছিলাম আমি।
তারপর, বড়ো নেকভক্তি নিয়ে বমি করছিলাম নতুন একটা কবরের ওপরে।
সেইখানে লেখা ছিল, ‘এই মৃতের নাম চিরকাল গোপন রহিবে।’
এখনও মধ্যে মধ্যে সেই বমির শ্যাওলা রঙের গন্ধ আমার নাকে আসে,
কিন্তু নামটা আর জানাই যায় না। কেউ নাকি জানবে না কোনদিন।
তারপর অনেক অনেকদিন পর ভোরে, আমি ঘুম-ঘুম চোখে দেখি,
লোকজন ভোট দিতে ছুটছে। বড়ো উৎসবের দিন যেন।
অধিকার হারানোর দিন। আমি দেখলাম, ডাকাতিয়া গ্রাম
ছুরি-চাপাতি খেলায় বড়োই মশগুল। প্রভূত আনন্দ চারিদিকে।
এই যে আমি চিন্তাটা করলাম, বউ বলেন, এটা আমার
চিন্তার একটা বদ-অভ্যাস মাত্র। আমি যে একদা বিদ্যালয়ে গেছি,
এটা তার কুফল। এতদিনে ফলল। কিন্তু আমার বউ বুদ্ধিমান।
তিনি যুদ্ধবিমান- টম্যাহক লীলা। আমার বউ তখন তরল আকাশে
মাছ-পক্ষির মিলনোৎসবে বোমার পর বোমা ফেলছেন।
আমি জানি, এটা হল লোকাল চালাকি। কপাট বন্ধ দরজার জানালার।
কি করি, কি করি, আমি সবুজ রঙের সোয়াটারটা একবার পরি, একবার খুলি।
জুতাজোড়া কানপট্টির মত ব্যবহার করি, কানে ঠাণ্ডা লাগলে
আমার বউ আমার উপর রাগ করতে পারেন। আমি তা চাই না।
এদিকে আমার মেরুন রঙের জাঙ্গিয়াটা ছিঁড়া, বউরে সেটা জানাই নাই।
মানুষের সংসারে কিছু শরমের কথা থাকেই থাকে। আমি উনার কাছেই শিখছি
কখন কি কারণে শরম পাওয়া সদাচারণের লক্ষণ। তাই আমি ঘরের ভিতর
আমার বউয়ের দেওয়া হাফ সোয়েটারটাকে ল্যাঙ্গুটের মত করে নুনু-পাছা ঢাকি।
কারণ, আমারও যে একটা মার্কা আছে এইটা আমি প্রকাশ করতে চাই না।
বউ আমাকে বলছেন, কোনদিন তুমি মার্কামারা হবা না। তুমি তো কেউ না।
তুমি একটা উছিলা মাত্র। আমার। তাঁর। তুমি মাত্র একটা নাম।
উঠানের কোণে একটা নিমগাছ পাতা আর ফুল এক সাথে ঝরাচ্ছে। কি রাগ গো!
যদিও নিমফুলের গন্ধ আমার খুব পছন্দ। ছোট ছোট সাদা নিমফুল ঝরে আর আমাকে শোনায়,
ভাবীজি কিন্তু ঠিকই বলছেন, আপনি একটা চুদির ভাই, নেকি লোভী বাল বালস্য বাল।
তবে, কথা আছে, বিশ^ব্যাংক বলেছেন, আপনের কবরটা খুঁড়তে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
এ খবরও প্রচার হচ্ছে আমেরিকা তার জন্য পাঠাবেন চকচকা ধারাল একটি কোদাল।























