শাহরুখ পিকলুর ৩ কবিতা

প্রকাশিত : মার্চ ১৪, ২০১৯

আয়না

যাবে যখন মনে ধরেছে, যাবেই
আয়নাটা ভাঙলে কেন তবে?

তোমার আমার হৃৎকম্পন ছিল
একই সুরে গাঁথা, বিনি সুতোর মালায়
একের পরে এক, যেন সারিবদ্ধ বসা
তোমার পরে আমি, আমার পরে
যেন একে অপরের প্রতিবিম্ব
প্রেমের সেকি শক্ত গাঁথুনি,
ইটের পরে ইট, চড়ে চড়ে সুউচ্চ
প্রেমের দালান, হায়
কে জানত তা হবে এতোটা ভঙ্গুর।
তবুও প্রলয় নেই, বিভীষিকা নেই
নেই সাইক্লোন বা ভূমিধস,
তবুও কোত্থেকে এলো এক ঝঞ্ঝা
ফাগুনের পলাশের আগুন ছাপিয়ে কালবোশেখী—
সেই, সেই লোকটাই তো!

তার মাঝে নেই সভ্যতা, নেই কালচার
কবিতা বলতে বোঝে রবিঠাকুরের আমাদের ছোট নদী,
গায় গান ফুলে ফুলে ঢ’লে ঢ’লে,
সাহিত্য মানে শরৎবাবু বা মাসুদ রানা, কুয়াশা, তামাশা।
স্থূল ধুলিকণায় বিসর্জন সহস্র বর্ষের প্রেম,
মোর প্রেমের সূক্ষ্ণ অনুভূতি!

তবূও যেতে হয়, যাও
দেহের ক্ষুণ্ণিবৃত্তি নিবারণে, শিকার হোক
বনের মৃগয়া বা ঘোৎ ঘোৎ করা শূকর,
রাতের গভীরে দেহের বিশেষ ক্ষুধা মেটানো
কিন্তু আয়নাটা ভেঙে গেলে কেন?

তুমি চলে গেলে
আমি আয়নার সামনে দাঁড়ালাম
নিজের নিজকে দেখতে কিন্তু
তা শত টুকরে মেঝেতে—
একেক অংশে একেক আমি
ছিঁড়ে খান খান!
সেই সব টুকরোতে একেকটা আমি—
প্রেমিক
স্বামী
প্রতারক
মদ্যপ
মৌপিয়াসী
লম্পট
পরনারী আসক্ত।

ভালোই করেছো আমাকে ছেড়ে পালিয়ে
দুমুখো সাপ আমি, ভয়ঙ্কর...
তবুও আয়নাটা ভেঙে আমায় ন্যাংটো করলে!
জগতে সবাই যে ন্যাংটো হয়েই আসে কিন্তু
যতই প্রলেপ লাগাক সবাই ন্যাংটো তবুও
আমার নগ্নতাকেই তোমার তুলে ধরতে হলো!

সুখ

সুখ কোনো মাতালের কাছে বোতলের শেষের রয়ে যাওয়া অংশ
সুখ প্রেমিকার ঠোঁটের স্পর্শ ছেলেটার শুষ্ক অধরে
সুখ ডাল ভাত দিয়ে ইলিশ মাছের দু টুকরো ভাজা
সুখ বেকার ছেলের হাতে চাকরির ইন্টারভিউ কার্ড
সুখ পরীক্ষায় ভোঁতা ছেলের অঙ্কে ‘এ’ পাওয়া
সুখ পরীক্ষার আগে বুয়েটের গেট বন্ধ
সুখ দেশের উন্নতি, যদিও সকলের কপাল সমান চওড়া না
সুখ কাজের দিনে হঠাৎ রাস্তা খালি পাওয়া, যানজট বিনা কারণে নির্বাসনে
সুখ খাঁটি সর্ষের তেল বা ঘিয়ের সন্ধান
সুখ সেই খাঁটিতে রাঁধিত তেহারি বা আমাদের দেশের কাচ্চি
সুখ গরমের দিনে ভরপেট খেয়ে ভাতঘুম, বিকেলে উঠে চায়ের সাথে টোস্ট বিস্কিট
সুখ সেই মেয়েটার চোখের একটা চাহনি, যা কিনা ঘড়ির কাঁটায় সেকেন্ড পার করে
সুখ তার নাম নীল খাম, সেকেলে আমার জন্য, হয়ত একটা ই-মেইল আজকাল
সুখ মায়ের ভালোবাসা, শত কষ্ট করেও তার কাছে পাওয়া বাউণ্ডুলে জীবনের খোরাক
সুখ বাবা মায়ের মাঝে সৌহার্দ্য দ্যাখা, ‘প্রেম’ না
সুখ ভাই-বোনদের সঙ্গে হল্লা করে ছবি দ্যাখা, হলের তেল চিটচিটে চিপস খাওয়া
সুখ প্রেমিকার সাথে বেড়াতে যাওয়া-রমনা গ্রীনে বা চন্দ্রার ছোট হয়ে আসা শালবনে
সুখ নিজের বাচ্চার মুখের প্রথম বুলি, মা না হয়ে যদি বাবা
আর...
আর...
সুখ কৃষকের সুখ সোনালি ধানের শীষে, সোনা কেনা যদিও সুদূরপরাহত তার জন্য।

তথাগতের দুঃখ

এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম
কিন্তু
কে পেল স্বাধীনতা, মুক্তি পেল কারা!
মৃত্যুর কবর ওই তো দেখা যায়
কে পেল স্বাধীনতা বা মুক্তি
কে পেল ব্যাংকের কাড়ি কাড়ি স্বাধীন মুক্তি!
মরণের কবরে দাঁড়িয়ে জিগ্যাসি আমি
মুক্তিযুদ্ধ করেছিল কোন সে পাগলজন
ভবিতব্যে তারাই কী হবে বিশ্বাসঘাতগণ
সবুজ আর চাঁদতারা ধরেনি বলেই কি তাদের মৃত্যু সমাসন্ন!

স্বাধীনতা তাদেরই যারা জমি লুটেছে
নদী লুটেছে
ধান লুটেছে
পাট লুটে ধ্বংস করেছে পুরো শিল্পটাকে
মাছ ধরে শূন্য করেছে জলাধার, জলমহাল
মানবিকতা লুটে মানুষকে করেছে নরাধম
পশু মেরে নিজেই হয়েছে পশু
পুরাণের খাটের তলার রাক্ষশ গেড়ে বসেছে হৃদয়ে
নদী ভরেছে, খাল ভরেছে, ভরেছে পুকুর
যোনি ভরেছে মিথ্যে আশ্বাসের দণ্ডে
প্রেম-ভালোবাসাকে করেছে ক্রিয়াপদ
ভিতর বাহির, ভিতর বাহির, মাল খালাস
খেলা শেষ, পরের ‘মাল’টা কেমন!

আর যদি একটা গুলি চলে...
চলেছে অনেক, মরেছেও বহু
অপরাধী কি না পরে বিচার হবে,
গুলি আছে তো বন্দুক চালাও
কে কী বলল, কে কী করল
পরে দ্যাখা যাবে, আগে অগ্নিস্ফূরণ
দেবীর তুষ্টিতে কাঁচা রক্ত
ঋতুস্রাবের রক্তের মতন!

মৃতের কবরে দাঁড়িয়ে বুঝছি শুধু
কবর বড়ই শীতল
জানে সে, যে বলেছিলো মুক্তির কথা—
তথাগতের তথাকথিত
কেউ তা শোনেনি, শুনবেও না।