আলোকচিত্রী: টুটুল নেছার
শিমুল সালাহ্উদ্দিনের একগুচ্ছ কবিতা
প্রকাশিত : জুন ০৭, ২০১৯
বালের বৃষ্টি
অহো বৃষ্টি
তুমি ধুয়ে দিতেছো এই খামোখা শহর
তার সমস্ত বিভীষিকা, জঞ্জাল
মানুষ প্রাণিটির একাকী অসহায়ত্ব
ধুয়ে নিয়ে যেতে পারতেছো না কেন, বাল!
তুমি কি তবে বালের বৃষ্টি
তুমি কী তবে ধানের দাম না পাওয়া কৃষক
তার দেয়ালের পাশে রাখা ব্যর্থ লাঙলের পরিশ্রান্ত ফাল
নাকি তুমি তরকারির কম মাংস তদুপরি বেশি ঝাল
নাকি তুমি কাঁঠাল পাতাটির নীরবে ভিজে যাওয়া ডাল
ঘন বন থেকে পাতলা সবুজ পাতাটিরে যে নতুন কাঁঠাল
হওয়ার দিকে ঠেলতেছে!
অহো বৃষ্টি, আসো, আমাদের একাকিত্ব ভিজায়ে যাও
যেন বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা সিনেমার নায়িকাটিরে
সোহাগে আদরে চিবুকটি ধরে বলতে পারি—
এসো বুকে, খাআআও, ভালো লাগে নাকি ঝাল!
এই সমস্ত কিছু কি তুমি পায়ে মারাও হে বৃষ্টি, বাল!
বৃষ্টি
এক.
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে। চারপাশ অন্ধকার। চলে যাওয়া তোমার মতো আকাশ ফাটিয়ে উঁকি দিচ্ছে ঝলক ঝলসানো বিজলি।
মুহূর্তের জন্য আলোকে ঝলসে যাচ্ছে পৃথিবীর ঘরবাড়ি। আমার শূন্য ঘরে, তোমার স্মৃতিলাশ আর তার টুকরো-টাকরা।
আমার শূন্য ঘর, তুমি এসো।
দুই.
বাইরে কি বৃষ্টি নেমেছে?
কেমন ঝিরঝির শব্দ শুনছি
বাড়ি ফেরার পথে এক পশলা
বৃষ্টি কি তোমাকে ভিজিয়ে গেল!
কিংবা ঠাণ্ডা হাওয়া ছুঁয়ে গেল বিষণ্ণ চিকুর
উড়ন্ত হাওয়ার বন্য বাতাস দ্যাখো
ভুলতেই দিচ্ছে না তোমাকে আমার কথা
বিশ্রীরকম পরশ দিয়ে যাচ্ছে তোমার যত্রতত্র
পৃথিবী কী এখনো জানে, বৃষ্টি এলে তোমার
শিমুল বাগান আর কাটাঝোঁপের কথা মনে পড়ে
মনে পড়ে দূর কাশবনে বাতাসের লীলা
কী হুল্লোর তুলে না হাসতে তুমি সেইসব দিনে
বৃষ্টিদের দ্যাখো নামতেই হয়,
আকাশের বুক ছেড়ে রোমশ ভুবনে ভুবনে।
বাইরে কি বৃষ্টি নেমেছে?
কেমন ঝিরঝির শব্দ শুনছি
কেঁদো না, ঘুমাও।
লেখালেখি
কত যে খেলো কারণে তুমি লেখো!
লেখো অকারণে!
লেখো তুমি সুখে থাকলে?
দুঃখে ভারাক্রান্ত হলে?
আনন্দে ভেসে গেলে?
শোকে পাথর হলে?
এক বিষণ্ণ গোলাপে নিজের গোপন টুকে রাখতে?
এক সমুদ্রবিষাদকে ঢালাও আনন্দে ঢেলে আঁকতে!
যে কারণই থাক না কেন তোমার লেখার,
তুমি লেখো, যা আছে ভেতরে তোমার
মানে তুমি এক ভেতরবাড়ি বসে লেখো
যা অন্যরা দেখতে পায় না,
তুমি যা বলো তার পাঠোদ্ধার করতে পারে না,
পারে না বুঝতে
ভেতরে কি অনুভব ঝড় বয়ে যাচ্ছে তোমার
বাক্যগুলির সেই ক্ষমতাই নেই অনুবাদ করে তোমার চিৎকার!
তুমি লেখো সেই অনুভূতিমালা, আঁধার ঢেলে দিয়ে দিবালোকে
যা বাইরে আসে না কস্মিনকালে
তুমি লেখো সেই শব্দটি, যা একদিন ভেবেছিলে
অথচ যা ছিল অনুভবে তা তুলে
আনতে পারার ক্ষমতা সেই শব্দের নাই।
তুমি লেখো সে জন্যেই তো, যে একদিন কেউ না কেউ
বুঝে ফেলবে কি লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলে তুমি বুকে!
কোন গোপন পাসওয়ার্ড!
না?
লেখো কবি, লেখো ষোল আনা, পাগলের মতো।
বিজ্ঞানীদের প্রতি সবিনয় নিবেদন
(প্রতিদিন আসছে অব্যহত ধর্ষণের খবর…)
হে মহাপৃথিবীর প্রথিতযশা বিজ্ঞানীগণ, অন্তত বাংলাদেশের কথা মাথায় রেখে সঙ্গমের আগেই পুত্রসন্তান হবে কী না যাচাই করার পদ্ধতিটি দ্রুত আবিষ্কার করুন।
পুত্রসন্তান ছাড়া কোনো সন্তানই হবে না আর, ভবিষ্যতের পুরুষপৃথিবী চোখের পর্দায় লাগানো ভিডিওতে দেখে নেবে নারীপুরুষের ভালোবাসামুখর ছিল একদিন এই চরাচর।
আমরা আছি এক আইয়ামে জাহেলিয়াতে, কন্যাসন্তান জন্মলাভের পর যে আরব্য জাতিটি তাদের কন্যাদের হত্যা করতো, আর নিশ্চিত বাঁচিয়ে দিতো কোনো না কোনো বয়সে ধর্ষণের হাত থেকে, সেই সময়ে।
প্রিয় বিজ্ঞানীগণ, আইয়ামে জাহেলিয়াতের প্রায় দেড়হাজার বছর পর উন্নয়নের রাজপথে অদম্য গতিতে ছুটে চলা বাংলাদেশে, আমরা একের পর এক, দুই চার ছয় বছরের, এমন কী তারো চেয়ে অতল সংখ্যাহীন কন্যাশিশুদের, দলবেঁধে ধর্ষণ করে, মেরে ফেলতে ফেলতে জনারণ্যে মিশে যেতে দেখছি আমাদেরই কাউকে কাউকে।
প্রিয় বিজ্ঞানীগণ, আপনারা জানেন বৈজ্ঞানিক যুক্তিপদ্ধতি। আপনারা মনকে পাত্তা দেন না, আপনারা পৌঁছান না হৃদয়ের দেনদরবার। আপনারা উন্নত মনন আর উচ্চরুচির পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ব্যঙ্গ করেছেন ডাল আইটেম বলে, কল্পনাপ্রতিভা মনে করে প্রেমিক কবিদের কথা তাচ্ছিল্যে হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন, পুঁজিপতিদের সাফল্যকে বলেছেন সাফল্য, মানবিকতার বিপর্যয় বড় কিছু নয় বলে সেক্সডল কোলে নিয়ে ভুলে গেছেন প্রেয়সীর অপেক্ষার মধুরতা।
এই সমস্ত পাপের প্রায়শ্চিত্তরূপে হলেও, পদ্ধতিটি আবিষ্কার করে দিন হে বিজ্ঞানীগণ, নইলে আতুরঘরেই আমরা হত্যা করতে শুরু করবো আবার আমাদের কন্যাশিশুদের। ধর্ষণের শিকার সন্তানের বাপ ভাই স্বজন কেউ হতে রাজি নই আমরা, প্রিয় বিজ্ঞানীগণ, একটু অনুগ্রহ করুন। অন্তত বাংলাদেশের পিতাদের জন্য বাতলে দিন, নিশ্চিত পুত্রসন্তান লাভের পদ্ধতি।
সহজ প্রেমের গান
সহজ প্রেমের গানের মতো সহজ করে বলি
ইচ্ছে করে তোমার পাশে একটু হাঁটি, চলি
তোমার মুখের ওপর থেকে সরিয়ে দিয়ে চুল
তাকিয়ে থাকি জাগিয়ে রাখি চোখমনিটার ফুল
তাকিয়ে থাকি সারাটা রাত ভয়াল সারা দিন
তারপরেতে যাই চলে যাই দূর, সেন্টমার্টিন
পাগল নাকি তুইরে শিমুল এমন তাকাস কেন?
বুকের ভেতর আঁধার ডাকে সন্ধ্যা হয় যেন!
আমি বলি, সন্ধ্যা হবে রাত্রি হবে নিশিথ হবে দিন
তোমায় নিয়ে যাব চলো সেন্ট-দূর-মার্টিন।
যাই
আমি তোমাদের ছেড়ে তাই জীবজগতের থেকে অনিবার অতল গুহার দিকে নেমে যাই, জলের ঘূর্ণিতে নামি-মাছের আঁশটে গন্ধে, ঘাসের ঘাঘরায় কাঁকড়া ও পতঙ্গের স্তরে স্তরে নামি— যাই...
আঁধারলেখন
ভাবছি লিখে ঘুমাই তোমায়, লিখবো অন্ধকার
ভুল কালোতে পা হড়কেছি লিখতে নারি আর!
লিখতে নারি প্রেমকবিতা লিখতে নারি দুখ
তোমায় শুধু হয় লেখা হয় তোমার কথাটুক
অস্তাচলে মিলিয়ে গেলে লিখবো আবার আমি
চেয়েছিলে এইতো তুমি, সবটুকু পাগলামি
তোমায় ঘিরে আবর্তিত নিবর্তিত হোক
আমার আমি যাক ধুয়ে যাক নাম-গন্ধ শোক
অথচ তোমায় বাসি ভালো আমায় বাসি বলে
আমারে ছাড়া ভালো আমি বাসবো কী আর জলে
আঙুল দিয়ে আল্পনাআঁক হঠাৎ দেবার মতো
মুহূর্তের ওই প্রেমের প্রতাপ মুহূর্তবৎ হতো
সেই কি ভালো ছিল তোমার সেই কি ছিল আলো!
আলোকে মোর চক্ষুদুটি অন্ধ করো বন্ধ করো আলো।
অন্ধ আমি আঙুলগুলি কীবোর্ড রাখবো আর
ভাববো লিখে ঘুমাবো হয়তো, আদতে একা
লিখবো অন্ধকার।
চুমু আক্রমণ
তোমার মন খারাপের গুষ্ঠি কিলাই
চুমু আক্রমণ
ইচ্ছেহৃদয় টুকরো বিলাই
চুমু আক্রমণ
তোমার অনিবার্য বয়স ভাঁজে
চুমু আক্রমণ
তোমার সকাল সন্ধ্যা হঠাৎ সাঁঝে
চুমু আক্রমণ
তোমার অন্ধকারের বন্ধ দ্বারে
গহন আড়াল পোশাক পারে
কল্পলতার অজাচারে
চুমু আক্রমণ
তোমার মন খারাপের সবটা শুষে
চুমু আক্রমণ
ওরে বুকের ভেতর মুখ গুঁজে আয়
চুমু আক্রমণ
সত্যি জানার পর
এ কার কাছে হৃদয় খুলে ধরলে সোনা!
বলে দিলে প্রাণের সকল কথামালা!
নিজস্ব মোহ, আনাগোনা!
সমস্ত চুম্বন মেখে নিয়ে রক্তে
রোমকূপে রন্ধ্রে রন্ধ্রে, ঢেলে দিয়ে
মনের বিজন ঘরের সমস্ত অন্ধকার, জ্বর
টের পেলে এক হঠাৎ সকালে
সে তোমার প্রেমিকার, বর
এতে ভার কল্পনার সংসার, ঘর,
যেসব লহমামুহূর্তে উঠলো বিষিয়ে
কীভাবে এসব টানবে এখন তুমি, বোকা মেয়ে?
আমি
আমি তো ঐরকমই,
যা তুমি ভাবছো আমায়
শাদাকে শাদাই বলি
কালোরা আমায় থামায়।
তবে কি! চাইলেই তো আর
সবকিছু যায় না করা
থামতে চাইছে যারা
সত্যিটা জানেন তারা
জানেন যে যায় না থামা
থামলে ভাস্কো ডা গামা
যেত নাকি আলাবামা
বারণ তাই থামিথামা
করো তা প্রাণ চাহে যা
করো আজ কাল নহে তা
বাঁচো জোর সবটুকুনি
নিষেধ সব ছত্রখানি
আমি তো ঐরকমই,
যা তুমি ভাবছো আমায়
শাদাকে শাদাই বলি
কালোরা আমায় থামায়।
আমাকে থামাতে চাও
তোমাকে ডাকবো কালো।
রোদন
চোখের জল মুছতে গিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম প্রাণ
বুকভর্তি বেদনপাহাড়
মৃত্যুঞ্জয় গান।
তুমি
তুমি খুব সুন্দর, আলোর অন্তরের মতো।
তোমার দুই চোখও।
অথচ দ্যাখো, এত সুন্দর চোখ, পাশাপাশি আছে দুটিতে,
এক চোখ আরেকটাকে কখনো দেখে না।
নাকের বাঁধ পেরিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে না কখনো।
ডুবসম্ভব চোখের মতো এত সুন্দর দুজনের পাশাপাশি থাকতে নেই,
বিপরীত মেরুতে হলেও মুখোমুখি থাকতে হয়।
পাশাপাশি থাকা তাই বেদনার। এসো, মুখোমুখি থাকি।
করি পান, পরম্পরা, বিষ।























