শেখ ফজলল করিমের কবিতাগুচ্ছ

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৯

স্বনামধন্য সাহিত্যিক শেখ ফজলল করিমের আজ মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৩৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ১৮৮২ সালের ৯ এপ্রিল বর্তমান লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা বাজার গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ছাড়পত্রের পক্ষ থেকে তার প্রয়াণ দিবসে একগুচ্ছ কবিতা পুনর্মুদ্রণ করা হলো:

স্বর্গ ও নরক

কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর?
মানুষেরি মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সুরাসুর!
রিপুর তাড়নে যখনই মোদের বিবেক পায় গো লয়,
আত্মগ্লানির নরক-অনলে তখনি পুড়িতে হয়।
প্রীতি ও প্রেমের পূণ্য বাঁধনে যবে মিলি পরষ্পরে,
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরি কুঁড়ে ঘরে।

তুলনা

সাত শত ক্রোশ করিয়া ভ্রমণ জ্ঞানীর অন্বেষণে,
সহসা একদা পেল সে প্রবীণ কোনো এক মহাজনে।
শুধাল, ”হে জ্ঞানী! আকাশের চেয়ে উচ্চতা বেশি কার?”
জ্ঞানী বলে, ”বাছা, সত্যের চেয়ে উঁচু নাহি কিছু আর।”
পুনঃ সে কহিল, ”পৃথিবীর চেয়ে ওজনে ভারী কি আছে?”
জ্ঞানী বলে, ”বাছা, নিষ্পাপ জনে দোষারোপ করা মিছে।”
জিজ্ঞাসে পুনঃ, ”পাথরের চেয়ে কি আছে অধিক শক্ত?”
জ্ঞানী বলে, ”বাছা, সেই যে হৃদয় জগদীম-প্রেম-ভক্ত।”
কহিল আবার, ”অনলের চেয়ে উত্তাপ বেশি কার?”
জ্ঞানী বলে, ”বাছা, ঈর্ষার কাছে বহ্নিতাপও ছার।”
পুছিল পথিক, ”বরফের চেয়ে শীতর কি কিছু নাই?”
জ্ঞানী বলে, ”বাছা স্বজন-বিমুখ হৃদয় যে ঠিক তাই।”
শুধাল সে জন, ”সাগর হইতে কে বেশি ধনবান?”
জ্ঞানী বলে, ”বাছা, তুষ্ট হৃদয় তারো চেয়ে গরীয়ান।”

সাধনসৌধ

প্রতিবেশীগণ প্রবীর খৃস্টে কহিল মিনতি করি,
তোমার লাগিয়া দিতে চাই প্রভু, সাধন-সৌধ গড়ি।
খৃস্ট কহেন, গড়ে দাও তবে স্রোতের উপরে ঘর
লোকে বলে, উহা হয় কি কখনো? অসম্ভব ঘোরতর।
মিষ্ট মধুর হাসিয়া প্রেমিক কহিল, বন্ধুগণ
সংসার সুখ-বাসনা পুষিয়া অন্তরে কোন জন
ভজনা করিলে, সে ভজন হয় ব্যর্থ, বিফল তার;
তরুতল মোর সবচেয়ে ভালো, নাহি চাই ঘরদ্বার।

বিশ্বদর্শন

জিব্রাইল জিজ্ঞাসিল নূহ পয়গাম্বরে
‘বলো, বলো বর্ষীয়ান, দয়া করে মোরে
এত বর্ষ আয়ু তব হলো বসুধার
কেমন দেখিলে তুমি বলো না ইহার?’
নূহ বলে, ‘মহাত্মন, কী বলিব আর
দেখিলাম, এক গৃহ, তার দুটি দ্বার,
এক দ্বার দিয়া জীব প্রবেশ করিয়া
অন্য দ্বারপথে সবে যেতেছে চলিয়া।’

এপিটাফ

আর্দ্র মহীতলে হেথা চির নিদ্রাগত
ব্যথাতুর দীন কবি, অফুরন্ত সাধ
ভুলে যাও একটি তার জনমের মতো
হয়তো সে করিয়াছে শত অপরাধ
পান্থপদ রেণুপুত এ শেষ ভবন
হতে পারে তার ভাগ্যে সুখের নন্দন।

গাঁয়ের ডাক

ধানের ক্ষেতে বাতাস নেচে যায়
দামাল ছেলের মতো
ডাক দে বলে, আয়রে তোরা আয়
ডাকব তোদের কত!

মুক্ত মাঠের মিষ্টি হাওয়া
জোটে না যা ভাগ্যে পাওয়া
হারাসনে ভাই অবহেলায় রে
দিন যে হলো গত।

ছোট্ট নদী কোন সুদূরে ধায়
বক্ষে রজত-ধারা
ডাক দে বলে, আয়রে ছুটে আয়
রুগ্ন সাহস-হারা।

লাগলে মাথায় বৃষ্টি-বাতাস
উলটে কি যায় সৃষ্টি আকাশ?
রোদের ভয়ে থাকলে শুয়ে রে
নৌকা বাইবে কারা?
ছোট্ট নদী কোন সুদূরে ধায়
বক্ষে রজত-ধারা।

সবুজ বনের শীতল কোলের কাছে
একটি খড়ো ঘর
ডাক দে বলে, ভুলেছো ভাই মোরে
তাই ভেবেছো পর।

ইটের পাঁজায় চক্ষু বুঁজে
নিত্য নুতন অভাব খুঁজে
শেষ হবে তোর জীবনধারা যে
থাকবে বালুচর।
সবুজ বনের শীতল কোণে রে
একটি খড়ো ঘর।

সাত-সকালে ঝাঁপি মাথায় চাষী
মাঠের দিকে যায়
ডাক দে বলে, “এই তো তোদের পথ
বাঁচতে যারা চায়।

পেটের ক্ষিদে মেটে না যার
এই রাতে ঠাঁই কোথা তার?
বাঁচতে হলে লাঙ্গল ধর রে
আবার এসে গাঁয়।”
সাত-সকালে ঝাঁপি মাথায় চাষী
মাঠের দিকে ধায়।