শ্রেয়া চক্রবর্তীর ৫ কবিতা

প্রকাশিত : জানুয়ারি ১২, ২০১৯

কবি মরে গেলে

কবি মরে গেলে ক্ষতি হয় কার কতটুকু
এ`শহর বেঁকে চলে ধস্ত ট্রামপথে
আনন্দের পায়ে এসে পড়ে জীবনের ঝুলন্ত লাশ
দুঃখ খায় খুদকুড়ো চুপচাপ বসে একপাশে

কবি মরে গেলে কার কি এলো গেলো?
টার্মিনাসে জড়ো হয় একে একে সবকটি বাস
ছেড়ে যাবে একটু পরেই যে যার মতো সিকিদামে
প্রেম করবে যুবক যুবতী
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বা বসে

যুবতীকে ছুঁতে এলে কেউ যুবকটি উদ্ধত হবে
ক্ষমা পাবেনা কেউ কারণ কবির মৃত্যুদিন
ভিখারী ভিক্ষা চাইবে একই নিরুত্তাপ জ্বরে
স্টিয়ারিং এ বসে থেকে আমাদেরও
বেড়ে যাবে অনন্তের ঋণ

কবি মরে গেলে জাগবেনা কেউ ঘুম থেকে
টাইমকলের জল বয়ে যাবে ফুটপাত দিয়ে
গণতন্ত্রের পোস্টার হাতে উৎসর্গ হবে রঙিন জনতা
ধ্যানে বসবে না কেউ
কাপড় মেলার তারে নির্বিকার বসে থাকা
পাখিটিও উড়ে যাবে

সন্ধ্যায় ব্ল্যাক হবে বায়োস্কোপের পাতা
সেজেগুজে দাঁড়াবে এসে শহরের নিষিদ্ধ দেবী
তর্পণ হবে এয়োতীর বিশুদ্ধ লাস্য যত
কাস্টমার জুটে যাবে যে যেমন দাঁড়াবে

কবি মরে গেলে কেউ কেউ চিঠি লেখা ছেড়ে
এসে দাঁড়াবে মন্চ্ঞে মাইক্রোফোনে
স্মৃতিসভা হবে কিছু এ`দল ও`দল মিলে
বোতল উৎসর্গ হবে মহামান্য মৃত্যুর নামে

কবিকে মনে রাখবে কেউ কবিতা না জেনেও
যে জেনেছে মনে তার পড়বেই
বেশকটি ছুঁয়ে যাওয়া লাইন
শব্দেরা তাড়িত করবে মগজের অবিনশ্বর ঘুমে
ঘুমের ভেতর তাও জেগে থাকে কেবল কবিরাই

কবি তো নিমিত্ত মাত্র,মরে গেলে ক্ষতি হয় কার?
ক্ষতি হয় সে শিশুর যে জন্মেছে এইমাত্র আজ
পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার অঙ্গীকার
ছিলো যে কবির
সে মানুষ চলে গেলে ক্ষতি হয়
শুধু মানুষেরই দেবতার!

বন্ধুতা

যে হাত তোমার হাতের কাছে আসে
গাছের মতো সহজগামী, ফুলের সম্ভাষে
তাকেও যদি ফিরিয়ে দিতে পারো—
তবে তোমার ও হাত কেন হাতটি মেলে থাকে?
ঠিক যেন এক মিশুক পাকি একটুখানি বসে
হঠাৎ করে ভ্যানিশ হবে আকাশ সংযোগে!
উড়িয়ে দিতে চাও?
পাখির কাছে পাতালমুখী হাতটি মেলে দাও।

অর্ধনারীশ্বর

প্রতিটি পুরুষের মধ্যে একজন নারী আছে
ছাইচাপা আগুনের মতো,
একদিন যার সাথে ঠিক দেখা হবে তার
আর দেখা মাত্রই সঙ্গম।

প্রতিটি নারীর মধ্যেও একটি পুরুষ আছে
খুব নির্জনে,
নারীটি যাকে খুঁজছে
খুঁজে পাবে একদিন
আর পাওয়া মাত্রই প্রেম!

স্পর্শসুখ

অনেক আঘাত নিয়ে আসবে ভেবেও
আমি স্পর্শ চাই তোমার
কেন এত লোভাতুর আমি
সে প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে, আসবেই।
অনেক আঘাত আসতে পারে জেনেও
মৃত্যুর পরোয়ানা মাথায় করে
কেন তুমি বেঁচে থাকতে চাও
সে প্রশ্ন নিজেকে করো
জিজ্ঞেস করো কিসের এই নেশা
সেকি ব্যথাতুর প্রেমের নাকি
স্পর্শাতীত কোনো এক বোধের
যা কীনা অনন্তের নাভিমূলে বুঁদ হয়ে আছে।

উন্মোচন

আমি নতজানু হয়ে রই ঘাসে
তুমি আর আসো না তো ফুলের বাঁ পাশে
ফুটেছে ফুল চাঁদের ভিতরে চাঁদ
নদীর গভীরে নদী আরও কতকিছু
মেঘ অরণ্যের মতো জেগে থাকে।
আমার তেষ্টা পায় খুব
ইচ্ছে করে, শুই ফুলমতী বাগিচার পাশে
কিন্তু ঝরনা নেই ফুলের আভাস নেই কোনো
বালুচর ডুবে গেছে সুরভির নীল ঋতুমাসে।
যে আছে কোথায় তার
পাশ দিয়ে চলে যেতে যেতে
আমার পিঠেতে শ্বাস নিবিড় হয়েছে যত
বুঝতে পেরেছি সেই, যে কীনা আসার ছিল
শ্রাবণে আজানুমেঘ এই বনবাসে।