সামসুল হকের কবিতা
প্রকাশিত : নভেম্বর ১৪, ২০১৮
কেমন করে যেন পশ্চিম বাংলার এই ষাট দশকের অন্যতম কবি হারিয়ে গেলেন— তা বাংলা কবিতার পাঠকরা জানতেও পারলেন না। একমাত্র যিনি বলতে পারতেন, বক্রোক্তি করতে পারতেন— তিনি এখন কাকদ্বীপে অচেনার দেশে নিশ্চুপ হয়ে আছেন, এখন আর কোনো কথা বলেন না, তার অনুরাগীদের মেজাজ ও অভদ্র আচরণ দিয়ে বিস্মিত করেন না। দরজার সামনে ‘প্রবেশ নিষেধ’ ঝুলিয়ে রাখেন না। কিন্তু ‘একুশ’টা কাব্যগ্রন্থ আমাদের সামনে, ধুলোয়, অজানায়, পড়ে আছে। ড.পাাবলো শাহি
খুনি
খুনিও কবিতা লেখে হঠাৎ-ই সে লেখে
‘সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়!’
জীবনানন্দের এই লাইনটি তুমি কেন লিখলে আবার
শুনে খুনি ঝড়ের ভিতর থেকে আন্তরিক বিস্মিত হয়েছে
ঝড়েরও বিস্ময় ছিলো
সে কেন খুনিকে দিলো চৌকোনীল উন্মত্ত স্তব্ধতা
সে কেন খুনিকে দিলো
নীল ভোর
কাঁচা আর
কিশোরীর প্রথম আঁচল
খুনিতো কবিতা লেখে
বলেছিলো অন্য-এক খুনি
শুনেছিলো অন্য-এক খুনি
যে প্রতিরাত্রেই তার কবরের শূন্য থেকে উঠে এসে
খুন করে কিশোর কবিকে
পিঁপড়ে আর মাছির আপনজন
‘ক’-হাতে ‘খ’-এর একজন খুন
তার নাম: খ-০০৫/১৪(৭০)
‘ক’-এর তৃপ্তি, ‘খ’-এর শোক-রাগ,
‘ক’-এর শত্রু খতম, ‘খ’-এর কথায়—শহিদ
ফলে, মিছিল, শোক-মিছিল, ক্রোধ-মিছিল, মালা ইত্যাদি
‘খ’-এর হাতে ‘ক’-এর একজন খুন,
তার নাম : ক-২০.০১৩(৪৭)
‘খ’-এর টেবিলে, পেপার-ওয়েটে উল্লাস,
‘ক’-এর ক্যালেন্ডারে কালো অক্ষরের দিন
ফলে, মিছিল, শোক-মিছিল, ক্রোধ-মিছিল, মালা ইত্যাদি
‘ক’-এর হাতে ‘ক’-এর একজন খুন,
ঠিকঠিক শব্দটি : শেষ-নিশ্বাস ত্যাগ,
‘খ’ অনবহিত, ইনডিফরেন্ট
‘ক’ প্রাত্যহিক কাজে ব্যস্ত
সবাই তৃপ্তিহীন, ক্রোধহীন,
লাশটার উপর পিঁপড়ের আর মাছির কোনো অবহেলা নেই।
ট্রেন যায়
কোথায় কিসের শব্দ— হয়তো ট্রেনের শব্দ যায়,—
বুঝি সারা কামরা জুড়ে চৈতন্য ভীষণ একা-একা,
পাহাড়তলির পথে ট্রেন যায়; শব্দ চলে যায়:
শব্দ কতোদূর যায়?— বাবা-মার শৈবাল-সত্তার?
ট্রেন যায়, অন্ধকার, তোমাকে স্বীকার করে নিয়ে;
ব্রিজের উপর দিয়ে চলার সময় ছায়া নেই—
শব্দ যায়, ভালোবাসা, তোমাকে স্বীকার করে নিয়ে...
ট্রেন ক্রমাগত যায়, স্টেশন কোথাও ছিলো না।
মিতকথন
১.
দ্বিচারিণী বোধ কখন বেঁধেছে সুষম স্বরের ঘর?
জীবন জেনেছি বিস্রস্তপ্রভা তিথিহীন চন্দ্রিকা...
২.
দীর্ঘখেত একলা থাকে, একলা থাকা স্বাভাবিক,
সময় হলে একক খেত ফসল ঘরে দিয়ে যায়।
৩.
ঈসকাইলাস শুয়ে আছে ভাঙা ফ্লাওয়ারভাসে।...
৪.
হরিণশিশু খেলা করে ফ্লাওয়ারভাসে।...
...........
হুলোবেড়াল উলটে দিলো ফ্লাওয়ারভাস। রানু,
আমি বনে ফিরে গিয়ে হরিণশিশু হবো।
৫.
ফ্যারাও, দ্বিতীয় স্বর্গের নির্মাণ
শেষ ক`রে তবু পেলে না তো অধিকার;
শেষাবধি তুমি কার হাতে সন্ধান
স্থাপন করলে? স্বরচিত সামগান
শুনবার মতো অবসর কোথা পেলে?
এমনি ক`রেই থেমে যায় সংস্তব।
আত্মপ্রণয় ছিলো না অসম্ভব
যদি রেখে দিতে প্রসারিত ভালোবাসা।
৬.
ভালোবাসা, তুমি পশ্চিমে কেন গেলে—
ললিত বৃক্ষ অপমানে মরে যায়;
শেষ সম্মান অনসূয়া ধরে রাখে:
তার দায়িত্ব নিশ্চিত চর্যায়
এবং ধৃত হোক। কার অপেক্ষা করো?
৭.
প্রেমের অপর নাম প্রথাহীন দায়িত্বগ্রহণ।
প্রেমের অপর নাম ধূ-ধূ মাঠ নিঃসঙ্গ নির্জন।
৮.
আমার নাম ধরে আমি বেদনা ডাকলাম,
বোধিদ্রুমের পাতা এখন ভীষণ ঝরে যায়।
৯.
প্রকৃত সমুদ্র কোন নিয়তির মধ্যে প্রবাহিত?
বোধের জাহাজে দীর্ঘ নিশ্চিত মাস্তুল
গলায় ঝুলিয়ে, চাঁদ সব সর্বনাশ পার হয়—
কোথায় সমুদ্র, বোধিজাহাজ, মাস্তুল?
সর্বনাশ পার হলে সফলতা পার হতে হয়...
১০.
বিছানায় আজ হচ্ছে নিলাম
কার খোঁপাচ্যুত ক্রিসান্থিমাম...
১১.
শূন্যতা, যখন তুমি চুমু খাবে নায়িকার মতোন কোমল,
এক হাত স্তনে রেখে ট্রিগার খুঁজবো, দেখো, অন্য করাঙ্গুলে।
১২.
সমাজ বা রাষ্ট্র-বিপ্লবের জন্যে প্রকৃতি কতোটা সহায়ক?
রমণের পূর্বে শৃঙ্গারের মতো? সুখ বা শান্তির জানে কে আছে চালক?
১৩.
স্বীকরণে শোকযাত্রার খুশি আসে।
কেন তরঙ্গ দোলাবো সেরিব্রামে
বেশিমাত্রায়? জীবন মাত্রাধিক
জমকালো হলে কেউ আর ভালোবাসে?
১৪.
তুমি আমার বন্ধু হবে?
প্রতিশ্রুতির অপরাহ্নে
সবাই কেমন বাতাসে তির্যক
পরস্পর ভাবছে দ্রুত:
আমিও কেবল পরিশ্রুত
...অন্য সবাই ভীষণ আহাম্মক।
১৫.
.............................ঘোড়াটা
জলের উপরে তার ছায়া দেখলো, বুঝতে পারলো—
কবিতা লোহিত;
লোহিতকে বড়ো ভয়। গদ্যের মতোন মাঠে ছোটালো চার-পা।
মাঠের পশ্চিমে সূর্য; ছায়া পূর্বে: স্বভাবত ঘোড়াটা আবার
ভয় পেলো, গদ্যের অসংখ্য পায়ে আসছে তার দিকে।
১৬.
এখন ভাসান দেবো জলে হিত ও অহিত,
স্থিতি আমার এবার হবে স্বয়ংবরা।
ট্রাপিজ
নিচে আস্তরণ ছিলো, কমপক্ষে, সুব্যবস্থা ছিলো,
বাঁশ, দড়ি, ইত্যাদি অনেক-কিছু ছিলো,
কয়েক হাজার চোখ ছিলো,
এখন সে-সব কিছু নেই,
তাঁবুটা, লোহার রড— কোনো কিছু নেই,
কেবল দুজন একপ্রান্তে থেকে অন্য শূন্যপ্রান্তে ক্রমাগত
দোল খাচ্ছে
দোল খাচ্ছে
দোল খাচ্ছে,
অবশেষে তারা বুঝলো, তারা
ভিন্ন অবয়ব নিয়ে ট্রাপিজের
খেলা খেলছে আজ,
শেষে ছেলে-মেয়ে-দুটো একে অপরের
নখ দিয়ে মাংস তুলে চতুর্দিকে ছুড়ে-ছুড়ে দিলো,
তারা ভাবলো,
মাংসখণ্ডগুলো ক্রমে দর্শকের
চোখের আকৃতি নিয়ে নেবে,
ক্ষতস্থান-থেকে-ঝরা রক্তগুলো
নিচে জাল হয়ে সেভ্ করবে,
অনুরূপ আশা করে পাৎলুন জাঙ্গিয়া ফেলে দিলো,
তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে তারা ফের ভাবলো—
রডদুটো ধরে থেকে এখন কী লাভ,
এই ভেবে ছেলেটি মেয়েটি রড ছেড়ে দিয়ে
শূন্য জড়াজড়ি করে
দোল খাচ্ছে দোল খাচ্ছে দোল—
আর, ঘোর জ্যোৎস্না থেকে কারা যেন হাততালি লাগালো খুব জোরে।























