হাসান মোস্তাফিজের একগুচ্ছ কবিতা

প্রকাশিত : আগস্ট ০৬, ২০১৯

স্মরণ

কার নাম স্মরণ করি ঘুমের ঘোরে
নতুন করে, দেয়ালে লিখে যাই দেশের কবিতা
কার জন্য
যুদ্ধ করে?
আবার তবে বিরূপ হাওয়ায়
বক্ষে নিই
কার নাম জ্বেলে?
সব নীল নক্ষত্র ফেলে?
চুপিচুপি শুনি তার কান্না
আবার ছায়ার সাথে
নতুন রাতে,
ভেবে ভেবে চলি কাণ্ডারির দিকে
নতুন শোকে,
বাজলো মাদল
আকাশ মাঝে
সুকান্তের সাজে।

বিষের বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে এখনো স্মরণ করি,
আবার তবে নতুন রূপে যাত্রা ধরি মরুর কণ্ঠে
নিশিরাতের চক্রবাকে।

গুহা

নির্জন অন্ধকার গুহায় শুয়ে তোমার কি লাভ হলো?
কিছু দেখা যায় না, অনুভূতি নেই
শ্যাওলার গন্ধে নাক কেঁপে উঠছে,
তাও তোমার খেয়াল নেই কেন?
যেখানে শুলে সেখানটা দেখেছো?
কেমন খসখসে, যেন কোনো রোগা কুকুরের সিক্ত জিহ্বা
আমার অস্বস্তি হয়, আর তুমি
আপনমনে চুমো খেয়ে যাচ্ছ গুহায় আঁকা অদ্ভুত কিছু চিত্রকলাতে
এর কারণ কি?
আমি কিছুই বলতে পারি না তোমাকে
কী বলব, আমি নিজেই বেতাল,
নাচার বদলে লাফাই
চুরির বদলে খালি কান্না করি
পিপাসা পেলেও পানি না গিলে হেঁটে চলি তোমার দিকে,
সেজন্যেই এই গুহায় আমি আজ তোমার সাথে
একদম নগ্ন।

কোথাও যাব না

ভাবছি আজকাল আর কোথাও যাব না
যেতে যে পারব না তা নয়, যেতে চাইলে পারব কোথাও যেতে,
কিন্তু কেন যাব? কই যাব? যেতেই বা হবে কেন?
মেঘ পড়ছে ড্রেনে, স্মৃতির সেই প্রথম দিন থেকে
আরো নীল হয়ে পথচারীরা হয়ে যাচ্ছে গুহাবাসী,
মৃদু রোদ ভেসে গেছে অন্ধকারের তলে
কোথাও যাব না,আমি আজ মানুষ বলে।
দিগন্ত শুধু নীরব-অপবাদে শরীর পচে
গন্ধে নাক সিটকায় পাঁচ পৃষ্ঠার মৃত্যু
যাও, চলে যাও তোমাদের মৌচাকের বাসায়
আমি বসে থাকব সিমেন্টের মাটিতে
একা।

লাল শরীর

তারিখ মনে নেই
শুধু মনে আছে সেদিন কোথাও যাইনি
ফ্লোর থেকে উঠিয়ে পাশের বাসার ভাইয়া বলেছিল, কিচ্ছু হয়নি তোমার
কিচ্ছু না।
ওদিকে আমি বুঝতে পারছি, রক্ত পড়ছে মাথা থেকে
রাগী ঝর্ণার মতো।
রিকশায় উঠতে গিয়েই মাটিতে পড়ে গিয়েছিলাম
রিকশাঅলা বলে উঠেছিল, হেতেরে উঠান দেহি,
দুজন মহিলা এগিয়ে আসলো তখন
একজন কপালের রক্ত মুছে দিয়েছিল, অন্যজন পিছনে আরেকটা কাপড় চেপে ধরেছিল
ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল, সাথে চক্ষুলজ্জা
বোন তখন দাঁড়িয়ে কেঁদে চলেছে
একমাত্র ভাই কীনা।
রিকশা চলতে লাগলো। পুরো শরীর ছিল লাল
রক্ত তখনও পড়ছে, স্কুল মাত্র ছুটি হয়েছিল,
আগ্রহী পথচারীরা আমাকে দেখতে লাগলো
বেশিভাগের চোখেই ছিল দয়া আর করুণা
দুইটি মেয়েকে হেসে উঠতে দেখলাম
তাদের একজন চেঁচিয়ে উঠল, তার ভুঁড়িটিতে এত লাল রং মেখে দিয়েছে কে?
হসপিটাল নিলো না। ডাক্তার গম্ভীর গলায় বলেছিল, এটা মারামারির কেস। জানলে পুলিশ আসবে।
আপনারা অন্য হসপিটালে নেন।
বোন তখনও কেঁদে চলেছে। ওর চোখে যেন অভিশপ্ত বর্ষার ছোবল লেগেছে।
এরপর আমি সিএনজিতে। দম নিতে পারছি না। শরীরের দুটি ফুসফুসে কেউ মনে হয় তালা মেরে দিয়েছে
হাঁপাতে হাঁপাতে মনে হচ্ছিল, মারা যাব
সিএনজিঅলা ভাড়া ঠিক না করেই নিয়ে যাচ্ছিল।
বারবার পিছনে ফিরে বলছিল, আহারে, ভাইডার রক্ত অনেক পড়ছে, না?
ওদিকে পাশের বাসার ভাইয়া অন্যান্য গাড়িগুলোকে ধমকাচ্ছেন।
চেঁচিয়ে বলছিলেন, আরে ছেলের মাথা ফেটেছে। আপনারা সরেন না।
লাভ তো হলোই না, ওদিকে ট্র্যাফিক পুলিশ সিগন্যাল দিয়ে জ্যাম বাঁধিয়ে দিলো।
বোন ওদিকে কেঁদেই চলেছে,
ওর হাত আমার মাথার পিছনে
কাপড়টা তখনও রক্তমাখা
আর শরীরটা ততক্ষণে লাল।